রাষ্ট্র কর্তৃক সংগঠিত অপরাধ-তৈমূর

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ  “ধর্মের ঢোল বাতাসে নড়ে” প্রবাদটি হাজার বৎসরের পূরোনো যা যুগ যুগ ধরে আবহমান বাংলায় মূখে মূখে চলে আসছে। ঐক্য ফ্রন্ট ও বিএনপি জোর গলাই বলে আসছিল যে, প্রশাসন ও পুলিশের মাধ্যমে সরকারী দল ২৯ই ডিসেম্বর/২০১৮ দিবাগত রাত্রে অর্থাৎ নির্বাচনের পূর্ব রাত্রেই নৌকায় সীল দিয়ে ব্যালট বক্স পরিপূর্ণ করে রেখেছে। সরকারের পক্ষ থেকে যতই সুষ্ঠ নির্বাচনের দাবী করা হয়েছে, ততই বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, টিআইবি রিপোর্ট, দেশী-বিদেশী গবেষনামূলক সংগঠনের বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের জাল জালিয়াতির কথা প্রকাশ পাচ্ছে। পাশাপাশি সরকার নিজেও তাদের পক্ষে অর্থাৎ সুষ্ঠ নির্বাচনের সাফাই গাচ্ছেন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে শেখ হাসিনা সরকার কোন প্রকার ক্রটি করছে না। ১১ই জানুয়ারি বামফ্রন্ট, ২২শে ফেব্রুয়ারি ঐক্য ফ্রন্টের গণ শুনানীতে প্রার্থীরা প্রকাশ্যে নির্বাচনে বিভিন্ন জাল জালিয়াতি, অনিয়ম, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা এবং আগের রাত্রে ভোট বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ তুলে ধরেছেন যা জাতীয় পত্রিকায় বক্তাদের বক্তব্য ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। এ দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিঃলজ্জের মত সুষ্ঠ নির্বাচনের সাফাই গাইতে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই ৮ই মার্চ/২০১৯ বলেন যে, “নির্বাচনের আগের রাত্রে ব্যালটে সিলমেরে বাক্স ভর্তি বন্ধ করতে ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার শুরু করা হবে।” তার বক্তব্য সরল স্বীকারোক্তি না মুখ ফসকে সত্যের প্রকাশ, তা যা হউক না কেন জনগণ মনে করবে যে, দেরীতে হলেও অভিযোগের স্বপক্ষে একটি স্বাক্ষ্য বা জবানবন্দী পাওয়া গেল, যা ইতিহাসের পাতায় একটি সুরক্ষিত দলিল হিসাবে থাকবে।

পৃথিবীর অনেক ঘটনা ধামা চাপা পড়ে থাকে, আবার অনেক ঘটনা খল নায়ককে নায়কে রূপান্তরিত করে, অন্য দিকে ভাগ্য দোষে কোথাও কোথাও নায়কের ভূমিকাও খল নায়কের চরিত্রে পরিষ্ফুটিত হয়। ইতিহাস বিকৃত হলে তো কথাই নেই। যে যার মত করেই অনেক সময় ইতিহাসকে রচনা করে গোষ্টিগত স্বার্থ বিবেচনা করে। তদুপরিও অনেক ধাপা চাপা দেয়ার পরও সত্যের প্রকাশ কোন না কোনভাবে হয়েই থাকে। গেল জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বা নির্বাচন কমিশনকে সরকার যতই সাধুবাদ জানাক না কেন সিইসি’র ইভিএম ব্যবহারের পক্ষের যুক্তিকে অর্থাৎ পূর্ব রাত্রে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার উদাহারনকে সরকার সমর্থন না করে বরং তথ্যমন্ত্রী বলেছে যে, সি.ই.সি’র বক্তব্যোর সাথে সরকার একমত পোষন করে না।

বিষয়টির উপর যদি একাডেমিক আলোচনা করি তবে বিশ্ববিখ্যাত রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, গবেষকদের মতে রাষ্ট্র অপরাধ করতে ও তা ধামা চাপা দিয়ে সাজা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম (ঝঃধঃব রং ধনষব ঃড় যরফব ঈৎরসবং ধহফ বংপধঢ়ব ঢ়ঁহরংযসবহঃ) মতামতটি সঠিক বলে প্রতিয়মান হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ঈযধসনষরংং (১৯৮৯) বলেছেন যে, একটি রাষ্ট্র দুইভাবে ফৌজদারী অপরাধ (ঈজওগঊ) করে। যথাঃ (১) সাংগঠিক ভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক সংগঠিত ফৌজদারী অপরাধ (ঝঃধঃব ড়ৎমধহরুবফ পৎরসব) এবং (২) অপরাধ করার জন্য রাষ্ট্র যোগানদাতা হিসাবে কাজ করা (ঝঃধঃব ংঢ়ড়হংড়ৎবফ পৎরসব)। গবেষক এৎববহ এবং ডধৎফ ২০০৪ সনে বলেছেন রাষ্ট্র তার বিভিন্ন এজেন্সী অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কার্যে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান এবং দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মচারী কর্মকর্তাদের দিয়ে অপরাধ সংগঠিত করায়। উক্ত গবেষকদের বক্তব্য এই যে, “ঝঃধঃব ঈৎরসব রং রষষবমধষ ড়ৎ ফবারধহঃ ধপঃরারঃরবং ঢ়বৎঢ়বঃৎধঃবফ নু, ড়ৎ রিঃয ঃযব পড়সঢ়ষরপরঃু ড়ভ ংঃধঃব ধমবহপরবং)”. রাষ্ট্র কর্তৃক সংগঠিত অপরাধ থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য অনেক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণ রক্ষাকবজ হিসাবে সংবিধান রচনা করে শুধুমাত্র রাষ্ট্র যন্ত্রনা থেকে রক্ষা পাওয়ার নিমিত্তে, কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যুগে যুগে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার ভুলষ্ঠিত ও নিষ্পেষিত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের মনোরঞ্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলির বুটের তলায়, অথচ তারা জনগণেরই বেতনভুক্ত কর্মচারী। রাষ্ট্র ধর্ম পালনে সত্য, ন্যায় ও মানবতা একটি বাতুলতা মাত্র যেখানে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ জড়িত।

আমাদের সমাজ, দেশ ও জাতি “সত্যের” অভাব এমনভাবে ভুগছে যেমন একটি “শরীর” হিমোগ্লোবিনের অভাবে রক্তশুন্য হয়ে দিন দিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, তিলে তিলে জীবন ক্ষয় রোগে চলার ও চেতনার নিজস্ব গতি হারিয়ে ফেলে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় “মিথ্যা” জাতির উপর এমনিভাবে চেপে বসেছে যে, তাকে (মিথ্যা) ঘাড় থেকে নামানোর শক্তি যেন জাতি হারিয়ে “সন্তান হারা” শোকে নিশ্বেষ ও নিঃশব্দ হয়ে পড়েছে।

সরকার বাহানা করে হউক বা প্রতিপক্ষ বিরোধীদের ঘায়েল করার জন্যই হউক দূর্নীতি বিরুদ্ধে কথিত “জিরো টলারেন্স” চাওর করে যাচ্ছেন, কিন্তু দুদকের তীর শুধু সরকার বিরোধীদের বুকে। দূর্নীতির ইংরেজী শব্দার্থ ঈড়ৎৎঁঢ়ঃ বা ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ। দূর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশে একটি কথিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যার নাম অহঃর-ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ ঈড়সসরংংরড়হ যাদের দায়িত্ব মূলত ও কার্যতঃ এখন শুধুমাত্র সরকারের তাবেদারী ও সরকার বিরোধীদের শায়েস্তা করা। সরকারের প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদরাই দুদকের টার্গেট। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এ সম্পর্কে অনেক উদাহরণ অবশ্যই জানা যাবে।

জনগণের কষ্ঠার্জিত অর্থে লালিত রাষ্ট্রীয় কর্মচারী/কর্মকর্তা, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক শুধুমাত্র জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার জন্য বেতন/ভাতা পেয়ে থাকে যাদের ইংরেজী পরিভাষায় চঁনষরপ ঝবৎাবহঃ বলা হয় এবং তারাই তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অর্থাৎ আইন প্রয়োগে স্বৈরাচারীমূলক দূর্নীতি করে। সরকারী আমলাদের (ইৎঁপৎধঃ) দায়িত্ব পালনে অর্থাৎ আইন প্রয়োগে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় অথবা আইন প্রয়োগে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া অথবা জনস্বার্থে যা করা উচিৎ নয় তাহাই করে আইন প্রয়োগে বৈষম্য (উওঝঈজওগওঘঅঞওঙঘ) করে অর্থাৎ একই আইন ক্ষমতাসীনদের ক্ষেত্রে এক রকম, সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করে, এমন পরিস্থিতিকে ঈজওগঊ অঘউ চঙখওঞওঈঝ নামক প্রবন্ধে অফষধর ঊ. ঝঃবাবহংড়হ “ঈঙজজটচঞ খঅড ঊঘঋঙজঈঊগঊঘঞ” বলে অখ্যায়িত করেছেন। আইন প্রয়োগে বা দায়িত্বে পালনে যারা আইনের স্বৈরাচারী মনোভাবে বিপরীত ভাবে ব্যবহার করে সে সব ঈড়ৎৎঁঢ়ঃবফ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন সংস্থা বা সংগঠন নাই। সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক একজন “ন্যায়পাল” (ঙগইটউঝগঅঘ) নিয়োগ দেয়ার বিধান থাকলেও থলের বিড়াল বেরিয়ে যাওয়ার আসংখ্যায় কোন সরকারই “ন্যায়পাল” নিয়োগের কোন উদ্দ্যোগ গ্রহণ করে নাই এবং দূর্নীতির বিরুদ্ধে কর্থিত “জিরো টলারেন্সের” শেখ হাসিনা সরকারও এ মর্মে কোন উদ্দ্যেগ গ্রহণ করছে না।

২৮ বৎসর পর মহামান্য হাই কোর্টের রায়ে দীর্ঘ প্রতিক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ অর্থাৎ ডাকসুর নির্বাচন ১১ই মার্চ ২০১৯ তারিখে বিগত জাতীয় নির্বাচনের আদলেই হয়ে গেল। উল্লেখ্য, থানার ওসি, এস.পি, ডি.সি’দের মতই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচ্চার্য সহ প্রশাসনিক সকল পোষ্টিং রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়ে আসছে। এ ধারা বাহিকতা দীর্ঘ দিনের, তবে এখন প্রকট থেকে প্রকটর হয়েছে। সকল বিশ্বদিব্যালয়েই শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির মধ্যে রাজনৈতিক মর্তাদর্শ ভিত্তিক শিক্ষক রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা সরকারী সমর্থক তারা নীল দল ও বিরোধীরা সাদা দল হিসাবে পরিচিত। নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সাদা দলকে কোন দায়িত্ব দেয়া হয় নাই বলে তপছিল ঘোষণার দিন থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের শিক্ষার্থীরা সিলমারা ব্যালট উদ্ধার করার দৃশ্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। অনিয়মের প্রতিবাদে সরব ছাত্রীদের ভূমিকা দেশবাসী প্রতক্ষ্য করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস নির্বাচনের একজন প্রতক্ষ্যদর্শী হিসাবে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা নি¤েœ তুলে ধরা হলো ঃ-

“২০১৮ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সিটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পর ডাকসু নির্বাচন নিয়ে একটি আশা টিমটিম করে জ্বলছিল। ওই দুই নির্বাচনের পর নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে দিয়েছিল। ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই আশার প্রদীপ এবার নিভে গেল কি না, সেই প্রশ্নের জন্ম হলো। ডাকসুর এই নির্বাচন, নির্বাচনী ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক কি না এবং এর মধ্য দিয়ে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়ে গেলাম কি না, সেই আশঙ্কাও দেখা দিল। কয়েকটি হলে আমি দেখেছি ভোটারদের কৃত্রিম লাইন, যেটা অনেক ভোটারও অভিযোগ আকারে বলছিলেন। ভোট দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন। এক ছাত্রকে আমি দেখলাম, সে সাভার থেকে আসে। তিন-চার ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে সে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অনেকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভোট দিতে না পেরে ফিরেও গেছে। রোকেয়া হলে আমরা দেখলাম দুই দফা ভোট হলো, আবার তা বাতিলও হলো। আর কুয়েত-মৈত্রী হলে যা ঘটল, তা খুবই ন্যক্কারজনক। ঢাকা বিশ্বদিব্যালয়ের জন্য এমন কলঙ্ক আর হতে পারে না। আমি মনে করি, এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। সুফিয়া কামাল হলে দেখলাম, একটি মেয়ে বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পরেও তাকে ভোট দিতে দেওয়া হলো না। আমি মনে করি, জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেমনি ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্বদিদ্যালয়ের নির্বাচনের দায়িত্ব থাকা প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হলো। কাজেই শিক্ষক হিসেবে আমরা যে একটি উচ্চ নৈতিকতার কথা বলতাম, সেটি আর থাকল না। এর কারণ হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষের শিক্ষকেরাই হলসহ বিভিন্ন প্রশাসনের দায়িত্ব পান। ফলে তাঁদের ভেতরে কোথাও এমনটা থাকে যে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনকে জয়ী করতে হবে” (সূত্রঃ জাতীয় পত্রিকা তাং- ১২/৩/২০১৯ ইং)।

জাতীয় নির্বাচন ২০১৮ এবং এর ধারা বাহিকতায় ঘটে যাওয়া পর পর কয়েকটি নির্বাচন এটাই প্রমাণ করে যে, একটি প্রতিদন্ধীতা বিহীন নির্বাচনী সাংস্কৃতি এদেশে চালু হয়েছে যা নিশ্চয় স্বাধীনতার চেতনার অনুকূলে নহে, বরং পরিপন্থী এবং স্বাধীনতার দাবীদের দ্বারাই বর্তমানে স্বাধীনতার চেতনা ভুলন্ঠিত হচ্ছে।

1