সাংসদ শামীম ওসমানের শ্যালকের বিরুদ্ধে মদ ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ!

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলায় বুড়িগঙ্গা নদীতে পরিচালিত ভাসমান রেঁস্তোরা মেরীএন্ডারসনে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান মদ ও বিয়ারসহ ৬৮ জনকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সোমবার মধ্যরাতে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) সুবাস চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। অভিযানে ১ হাজার ৯২০ ক্যান বিয়ার, ৪২ বোতল বিদেশী মদ এবং ৭৫ বোতল দেশীয় কেরু কোম্পানীর মদ উদ্ধার ও মদ-বিয়ার বিক্রির প্রায় ৪৯ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতার ৬৮জনসহ মোট ৬৯ জনের বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন ডিবি পুলিশের এসআই প্রকাশ চন্দ্র সরকার।
গ্রেফতার ৬৮ জনের মধ্যে ২৫ জন মেরী এন্ডারসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী। গ্রেফতারকৃত ওই ২৫ জনকে মাদক ব্যবসায়ি হিসেবে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ২৩ জন সেখানে মদ-বিয়ার পানরত অবস্থায় ছিলেন বলে এজাহারে বলা হয়। এছাড়া ভাসমান রেস্তোঁরা কাম বারটির ইজারাদার সঞ্জয় রায়কে মামলায় পলাতক দেখানো হয়েছে। মামলায় বারের ইজারাদার সঞ্জয় রায়ের সহযোগি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। টিটু বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব ক্রিকেট দলের সঙ্গে থাইল্যান্ড অবস্থান করছেন। সেখানে একটি সিক্স-এ সাইড ক্রিকেট টুর্ণামেন্টে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব অংশ নিচ্ছে বলে ক্লাবের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
তানভীর আহমেদ টিটু নারায়ণগঞ্জে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিত। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ঐতিহ্যবাহি নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ২ বারের সভাপতি তিনি। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের ৩ বারের পরিচালক, এফবিসিসিআই’র সাধারণ পরিষদের সদস্য ছিলেন। এছাড়া গত বছর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের পরিচালক পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন তিনি। প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের কিছু কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা ধরণের অভিযোগ উঠলেও সাংসদ শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটুর বিরুদ্ধে অতীতে কখনো কোন অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার কোন অভিযোগ উঠেনি।
হঠাৎ করে মদ ও বিয়ার ব্যবসায়ির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তার নাম উঠে আসায় নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজ তথা ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ টিটুর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পুলিশ কেন কেউই প্রমাণ করতে পারবেন না।
টিটুকে মদ ব্যবসায়ির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মামলার আসামী করা হচ্ছে জানতে পেরে গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কর্মাস, নারায়ণগঞ্জ দোকান মালিক সমিতি ও নারায়ণগঞ্জ দোকান কর্মচারী সমিতি রাইফেল ক্লাবে জরুরি সভায় বসেন। তারা টিটুর বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য পুলিশের প্রতি আল্টিমেটাম দেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, এভাবে নারায়ণগঞ্জের সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বায়বীয় অভিযোগ দাঁড় করিয়ে হয়রাণি ও সম্মানহানির চেষ্টা অব্যাহত থাকলে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে এবং প্রয়োজনে নগরের সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে সড়ক অবরোধ করা হবে।
এদিকে সোমবার রাতের অভিযান নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্বিক) মনিরুল ইসলাম। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। ক্রীড়া সংগঠন ও সাংসদ শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটুকে মাদক ব্যবসায়ির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, মেরী এন্ডারসনের যে ২৫ জন কর্মীকে মদ-বিয়ারসহ গ্রেফতার করা হয়েছে তারা পুলিশকে জানিয়েছে বারটির ইজারাদার ঢাকারবাসিন্দা সঞ্জয় রায় নামে এক ব্যক্তি। তাকে সহযোগিতা করেন তানভীর আহমেদ টিটু। বিষয়টি তদন্তের পর নিশ্চিত করে বলা যাবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উল্লেখ করা হয়, উদ্ধার করা মদ-বিয়ারের কোন বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় মেরী এন্ডারসনের ২৫ কর্মীসহ মোট ৬৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
যদিও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে বার পরিচালনার জন্য লাইসেন্স থাকার কথা রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া প্রকাশ্যে এভাবে মদ বিয়ার বিক্রির কথা নয়।
বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম চেঙ্গিস বলেন, টিটুর বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ শুনে আমরা হতবাক। কারণ টিটুকে আমরা একজন সফল ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেই জানি। তার বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ আনার আগে পুলিশ প্রশাসনকে আরেকটু ভাল করে খোঁজ খবর নেওয়া উচিত ছিল যে কোথাও কোন ভুল হচ্ছে কি না। অথবা বিষয়টি উদ্দেশ্য প্রণোদিতও হতে পারে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম ডালিম বলেন, টিটু একজন সফল ক্রীড়া সংগঠক। নারায়ণগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গনের যখন দুঃসময় তখন টিটু তার নিজ অর্থায়নে অনেক ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের আয়োজন করেছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার জন্য অনেক করেছেন। ক্রীড়াঙ্গনের প্রয়োজনে তিনি নিজ পকেট থেকে টাকা খরচ করে থাকেন। তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অনাকাঙ্খিত। বিষয়টি আরও ভালভাবে খতিয়ে দেখার পর তার নাম প্রকাশ করা যেত। কারণ অন্যের কর্মচারীদের কথায় সম্মানিত কাউকে এভাবে হেয় করা উচিত হয়নি।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ সভাপতি ইসমাইল হোসেন বাবুল বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। টিটু শুধু একজন সফল ক্রীড়া সংগঠকই নয় বরং একজন সফল ব্যবসায়িও বটে। তার মদ ব্যবসায়িকে পৃষ্ঠপোষকতা করে টাকা উপার্জনের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল বলেন, বিষয়টি অবিশ^াস্য। কারণ নারায়ণগঞ্জের যারা টিটুকে জানেন এবং চিনেন তারা টিটু সর্ম্পকে স্পষ্ট ধারণা রাখেন। টিটু গার্মেন্ট এক্সেসরিজ আমদানির ব্যবসা করেন। এছাড়াও তার আরও কয়েকটি ব্যবসা রয়েছে। তার বড় ভাই শামীম আহমেদ আমেরিকা প্রবাসী এবং সেখানকার চিকিৎসক।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন তালুকদার বলেন, গতকাল বিকেলে এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলাটি ডিবি পুলিশই তদন্ত করবেন।
ডিবি পুলিশের ওসি এনামুল হক বলেন, গ্রেফতারকৃত ৬৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক হাবিবুর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ড শুনানী আগামী কাল বুধবার অনুষ্ঠিত হবে।

1