রাজনৈতিক দলে রাজনীতি নাই-তৈমূর

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ ৩১শে মার্চ/২০১৯ বাংলাদেশে ৪র্থ ধাপে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো যাহাতে মাইকিং করেও ভোট কেন্দ্রে ভোটার আনা যায় নাই (কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মসজিদের মাইকে ভোট কেন্দ্রে ভোটার যাওয়ার জন্য আহব্বান জানানোর পরও কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিত হয় নাই)। ভোট দানে ভোটারদের অনীহা সম্পর্কে জ্যোষ্ঠ্য নির্বাচন কমিশনার জানান যে, “নির্বাচন বিষয়ে অনাস্থা থেকেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। যেসব কারণে আমরা ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছি, যে সবের কারণ খুজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত আবশ্যক। এমতাবস্থায় ভোটারদের উপর এ দায় চাপানো ঠিক নয়। বিগত দুই বছরে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আতœসমালোচনা প্রয়োজন। ওই সব নির্বাচনে যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে, সেগুলো পুনরাবৃত্তি রোধ করা দরকার” (সূত্র: ০১/৪/২০১৯ ইং তারিখে জাতীয় পত্রিকা)।

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্র ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে কলঙ্কের তিলক পড়িয়েছে। ভোটাধিকারকে কুলষিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরের ব্যবস্থাপনা যা জনগণের অর্থে পরিচালিত তারা সকলেই এ কলঙ্কের অংশিদারীত্ব নিয়েছে। জাতীয় সম্প্রচার অর্থাৎ বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতার নগ্নভাবে সরকারী দলের পক্ষপাতিত্ব করেছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক এক মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশন আর বাংলাদেশ বেতারের প্রধান বুলেটিন মোতাবেক সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর খবরের মোট হিস্যা এই ছিল যে, আওয়ামী লীগ আর জোটসঙ্গীদের জন্য বরাদ্দ সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে বিটিভির হিসাবটা দাঁড়ায় ৩৬১ মিনিট বনাম ১ মিনিট। আর বেতারে হিসাবটা ২৪৯ মিনিট বনাম ৪ মিনিট। নির্বাচনের আগে আর পরে এক মাসের প্রধান বুলেটিন ও সংবাদ পর্যালোচনা এবং নির্দিষ্ট কিছু অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে জাতীয় মিডিয়াতে এ হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। গণমাধ্যম দুটি চলে জনগণের টাকায়, কিন্তু পরিচালিত হয় সরকারের অধীনে। এখানে খবর বাছাই বা খবরের গুরুত্ব নির্ণয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি পক্ষপাত সুস্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীনের মতে, এ প্রবণতা নতুন কিছু নয়। বেতার ও বিটিভি বস্তুত ক্ষমতাসীন দলের চ্যানেল এবং মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। নির্বাচনী খবর ও পর্যালোচনায় সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল-জোটের অনুপস্থিতি হচ্ছে এ প্রবণতার একটি দিক। পর্যবেক্ষনে দেখা যায় যে, নির্বাচন কমিশনের তৎপরতার খবরও খুব কম জায়গা পেয়েছে। নির্বাচনী মামলা-হামলা বা অনিয়মের বিষয়ে কোনো খবরই প্রর্দশিত বা প্রকাশ হয়নি। নির্বাচনের পরে বেড়ে গেছে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে’ ধাঁচের খবর। তখন সব খবর সরকারময়। কেউ সরকার বা নির্বাচনের সমালোচনা করলে সেটা সংবাদ হয়নি। অথচ সরকারদলীয় নেতা যখন সমালোচনাকে নিন্দামন্দ করেছেন, সেটা খবর হয়েছে। খবরে ঢুকেছে সরকারতোষী মন্তব্য। তবে বিটিভি-বেতারের এসব নির্বাচনী খবরে গণমানুষের আগ্রহ ছিল না। সাধারণ সমীক্ষায় দেখা যায় যে, নির্বাচনের সময় জনগণ বিটিভি দেখিনি। অন্য চ্যানেল দেখেছে। কারণ সরকারের এই চ্যানেল দেখে কোনো লাভ নাই। সরকারের খবর ছাড়া অন্য খবর থাকে না বলে জনগণ বিটিভি দেখেননি। জনতার মতে সরকারের উন্নয়নের খবর জানতে চাইলে বিটিভি দেখা যেতে পারে। জাতীয় মিডিয়ার পর্যবেক্ষনে দেখা যায় যে, বিটিভিতে রাত আটটার খবরের ২৭ দিনের এবং বেতারে রাত সাড়ে আটটার খবরের ২৯ দিনের সময় মাপা হয়েছে। হিসাব নিকাশ করে পর্যবেক্ষনে আরো প্রকাশ পায় যে, নির্বাচন সংক্রান্ত আলোচনা অনুষ্ঠান, সরকারের উন্নয়নকাজ নিয়ে আলোচনা আলেখ্য, প্রচারণাধর্মী গান ও প্রামান্যচিত্র। বিটিভিতে দেখা বুলেটিনের মোট সময়কাল ছিল ৮২০ মিনিট। এর প্রায় অর্ধেকজুড়ে ছিল নির্বাচন সংক্রান্ত খবর। বেতারে শোনা বুলেটিনের মোট সময়কাল ছিল ৭২৫ মিনিট, নির্বাচন সংক্রান্ত খবরের হিস্যা অর্ধেকের কিছু কম। কোনোটিতেই বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বীদের খবর নির্বাচন সংক্রান্ত খবরের এক শতাংশের বেশি দখল করতে পারেনি। আর নির্বাচনী খবরে সরকারি দল-জোটের হিস্যা ৮০ শতাংশের বেশি থেকেছে (সূত্র: ২৮/৩/২০১৯ ইং তারিখের জাতীয় পত্রিকা)।

এক সময় এ দেশের মানুষ বিটিভিকে “সাহেব বিবি গোলামের” বাক্স বলে সম্ভোধন করতো। বর্তমানে তার কোন ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বরং বিরোধীদের কুৎসা প্রচারের জন্য বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতার নগ্নভাবে ব্যবহ্নত হয়ে আসছে। ফলে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিতির মত জাতীয় সম্প্রচারনে প্রতি জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে বিধায় বিটিভি ও বেতারের সংস্পর্ষ মানুষ ত্যাগ করেছে। ফলে সঠিক সংবাদ পাওয়ার জন্য ভিন্ন চ্যানেল বা বিদেশী চ্যানেলের উপর জনগণ’কে নির্ভর করতে হচ্ছে।

গত ২৬/৩/২০১৯ ইং তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নিশ্চিত করে বলেছে যে, “বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়নি। এই দপ্তরের মুখপাত্র রবাট পালডিনো ২৬/৩/২০১৯ ইং তারিখে ওয়াশিংটনে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এর আগে প্রকাশিত মার্কিন প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে টেনে করা প্রশ্নের জবাবে রবার্ট পালডিনো বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, বিরোধী দলের ভোটার ও এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানোসহ নানা ধরনের অনিয়মের খবর পাওয়া গেছে (সূত্র: ২৮/৩/২০১৯ ইং তারিখের জাতীয় পত্রিকা)।”

জাতীয় নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনের আদলে অনুষ্ঠিত অন্যান্য পাবলিক নির্বাচনে রাষ্ট্র, সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, আমলাতন্ত্র ও আমলাতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থার কলঙ্কজনক কার্যক্রম উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বটে, তবে উপসংহারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রবীন শিক্ষক অধ্যাপক ফজলুল হকের মন্তব্য দিয়ে ইতিটানতে চাই। ০১/৪/২০১৯ ইং তারিখে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ফ্রি থিংকার্স ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি অকপটে বলেছেন যে, “আজ দেশের স্বনামধন্য নির্বাচন কমিশন নিন্দিত অবস্থায় চলে গেছে। গণতন্ত্র এখন ভয়ানক খারাপ অবস্থায় আছে। মানুষের ভোটের অধিকার নেই। রাজনীতি হয়ে গেছে রাজনৈতিক দল ছাড়া।”

বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা এই যে, রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে বা নিয়ন্ত্রণে নাই। আন্তর্জাতিক রাজনীতি গোয়েন্দা ও অর্থশালীদের দখলে চলে গেছে। আইন প্রনয়ন ও প্রয়োগ হচ্ছে জনগণের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বোদ্দাদের মতে  অর্থাৎ প্রভাবশালীদের প্রভাবেই আইন প্রনীত হয়। বোদ্দাগণ এটাও মনে করেন যে,  নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সংবিধানে যাহাই লিপিবদ্ধ থাকুক, প্রভাবশালীদের হাতের মূঠোই জিম্মি গণমানুষের অধিকার।

“রাজনৈতিক দলে রাজনীতি নাই” বলে অধ্যাপক ফজলুল হকের বক্তব্য খুবই প্রনিধানযোগ্য এবং সময়ের প্রতিফলন। বড় রাজনৈতিক দলে এর আধিক্ষ্য ও প্রভাববেশী, ফলে তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব কোনঠাসা বিধায় রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তগুলিও অজগণ ঝঞঅখঊ চলে আসছে। জার্মানীর চ্যানচেলর এর মতে অর্থাৎ সম্ভবনা অর্থাৎ জাতিগত সম্ভবনা এখন একটি সুবিধা ভোগী চক্রের হাতে বন্দী হওয়ার গণমানুষকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে  কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি বিদ্বেষ, আক্রোসমূলক ও প্রতিহিংসামূলক অবস্থায় দাড়িয়েছে যার মাত্রাস্থল চরম শিখরে নিয়েছে বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকার ও সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সংগঠন তাদের আইন প্রয়োগ নামক ভোতা অস্ত্রের অপব্যবহারের মাধ্যমে। বিদ্বেষ এতোই চরমে উঠেছে যে, ৭৪ বৎসরের একজন অসুস্থ নারীকে যিনি ৩ বার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তার চিকিৎসা ও মুক্তির জন্য রাষ্ট্রের কৌশল ও অপকৌশলের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই বুঝা যাবে যে, বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য কতটুকু খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো তা “ভবিষ্যতেই” বলতে পারবে। রাজনৈতিক নোংরামী কোন পর্যায়ে পৌচেছে তা নিয়ে বিশেষ আলোচনা প্রয়োজন পড়ে না। কারণ এফ আর টাওয়ারের অগ্নি সংযোগে শিশু বালককে পুরুষ্কারের লোভ দেখিয়ে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কুৎসা রচনা করে মিডিয়াতে প্রকাশের মাধ্যমে চরম নোংরামীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিবেকে এ কুৎসা রটনা সম্পর্কে কতটুকু প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা দেখার জন্য জনগণ অবশ্যই তাকিয়ে থাকবে। তবে শিশু বালকের মুখ থেকে বক ধার্মীক মিডিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে পুরুষ্কারের লোভ দেখিয়ে যে বক্তব্য নেয়া হয়েছে, এ ধরনের বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ও তার পরিষদ বর্গ হর হামেসাই বলে আসছেন, বিশেষ করে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনী একতরফা প্রচার প্রচারনায়।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও রাজনীতি মাফিয়াদের কারণে এমনিভাবে পচন ধরছে যার দুর্গন্ধ গোটা জাতিকে ভোগ করতে হচ্ছে যা থেকে পরিত্রাণের হাতিয়ার হতে পারে জাতির জাগ্রত বিবেক ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। ২০১৮ ইং সালের আদলে অনুষ্ঠিত ২০১৯ ইং সনের পাবলিক নির্বাচনগুলি প্রমাণ করে যে, গতানুগতিক নির্বাচনিক ব্যবস্থাপনায় ভোটাধিকারের প্রশ্নে গণমানুষের আশা আখ্যাংকার কোনদিনই প্রতিফলন ঘটবে না, শত অত্যাচার নির্যাতন করেও ক্ষমতাসীনরাই ক্ষমতায় থাকবে। রাজনীতি ও রাষ্ট্র চলবে আমলা নির্ভর, রাজনৈতিক কর্মীরা ছিটকে পড়ছে এবং পড়বে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির উম্মেসীত হওয়ার পরিবর্তে মুখ থুবড়ে পড়বে, যদি না জাতির বিবেক জাগ্রত হয় (!)

1