ছাত্রী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি থেকে পরিত্রাণে বৈঠক

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ  শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি থেকে পরিত্রাণের উপায় ও করণীয় শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা প্রেস ক্লাবের আয়োজনে বৃহস্পতিবার বিকালে সিদ্ধিরগঞ্জের তাজমহল চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা প্রেস ক্লাবের সভাপতি হোসেন চিশতী সিপলু’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সরকারী আদমজীনগর এমডব্লিউ কলেজের অধ্যক্ষ নূর আক্তার, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অফিসার্স ইনচার্জ মীর শাহীন শাহ পারভেজ, বিশিষ্ট কলাম লেখক ও রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মীর আব্দুল আলিম, দৈনিক জনকণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার মোঃ খলিলুর রহমান, নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটনেট এর প্রধান সম্পাদক শাহজাহান শামীম, নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক ও নাসিক ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুল হক হাসান, নারী কাউন্সিলর আয়শা আক্তার দিনা, নারায়ণগঞ্জ মহানগর হেফাজত ইসলামের মহাসচিব মাওলানা ফেরদৌসুর রহমান, মিজমিজি পশ্চিমপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল মতিন মিল্টন, মজিব ফ্যাশনের এমডি ও তরুণ যুবনেতা মাহমুদুর রহমান। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসাইনের সঞ্চালনে গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ডেইলী স্টারের জেলা প্রতিনিধি সনদ সাহা সানী, আরটিভির জেলা প্রতিনিধি শাহাদাত হোসেন স্বপন, কালের কণ্ঠের সাংবাদিক আসাদুজ্জামান নূর, বাংলাদেশ প্রতিনিধির সাংবাদিক এম এ শাহীন, ফটোসাংবাদিক বিশাল আহমেদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে কোরআন তেলাওয়াত করেন ফিরোজিয়া ইসলামিক মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ মাওলানা মোঃ মনিরুজ্জামান সোহেল। গোলটেবিল বৈঠকের মিডিয়া পার্টনার ছিল নিউজ নারায়ণগঞ্জ২৪ ডটনেট।
গোলটেবিল বৈঠকে সরকারী আদমজীনগর এম ডব্লিউ কলেজের অধ্যক্ষ নূর আক্তার পলি বলেন, ছাত্রী ধর্ষণকারীরা কখনও শিক্ষক হতে পারেনা। এই মহান শব্দটি তাদের নামের পাশে আনা উচিৎ হবেনা। যারা এমন অপরাধে জড়িত থাকবে, প্রকাশ্যে তাদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর শাহীন শাহ পারভেজ বলেন, যারা ছাত্রীদের ধর্ষণ করে, তাদেরকে শিক্ষক বলা যাবেনা। তারা কুলাঙ্গার। মা-বাবার পর মানুষ গড়ার কারিগর এই শিক্ষক সমাজ। পূর্বের মত বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্মানজনক সেই সম্পর্ক অনেকাংশে লোপ পেয়েছে। যা সত্যিই হতাশাজনক। এর আগে কখনও শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের এমন নজীরবিহীন খবর শুনিনি। আমি সত্যিই হতভম্ব। দায়িত্ব অভিভাবকদের। সন্তানদের বাসা থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। অবুঝ কাঁদামাটিকে গড়ে তুলতে হবে। তাদের সব বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হবে। শিক্ষক নামে ওই নরপশুরা ছাত্রীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে অপকর্ম করে। ধর্ষণের শিকার এসব ছাত্রীরাও ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারেনা। তাই সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকদেরই। তাছাড়া স্বীকৃতি ছাড়া এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকা উচিৎ নয়। এগুলো বন্ধ করতে হবে স্থানীয়দের সহযোগীতায় শিক্ষা অফিসারকে অবগত করে। ভালো ব্যক্তিদের নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি গঠন করতে হবে। আমার কেউ অভিযোগ করলে আমি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
বিশিষ্ট কলামিষ্ট ও রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, আমাদের দেশে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা অনেকাংশে বেড়ে গেছে। যারা এমন করছে, তারা শিক্ষক নয়। তারা পশু। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ধর্ষণ রোধে আইনের প্রয়োগের অভাব রয়েছে, তা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দলিয় প্রভাবমুক্ত নয়। যা দূর করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুল হক হাসান বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা প্রেসক্লাবের এমন আয়োজনকে স্বাগত জানাই। শিক্ষক নিয়ে সমালোচনা করতে খুবই কষ্ট লাগছে। বর্তমান সমাজে কোন ঘটনা ঘটলে কিছুদিন আলোচনা থাকে। পরে আর কোন ধরনের সুরাহা হয়না। বর্তমানে ব্যবসায়ীক স্কুল ও মাদ্রাসা অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে। কারা এগুলো পরিচালনা করছে, কীভাবে করছে, কারও কোন খবর নেই। কেও যাচইও করেনা। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই অনুমোদন নেই। সন্তানদের সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি জনসচেতনতার বাইরে আর কিছু নেই।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ৭,৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর আয়েশা আক্তার দ্বীনা বলেন, বর্তমানে বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীক হয়ে গেছে। অভিভাবকরাও বাচ্চাদের খোজ রাখেনা। তাছাড়া শিক্ষকদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের সন্তান মনে করতে হবে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আইনজীবিরা যেন ধর্ষকদের পক্ষে আদালতে না দাড়ায়। সরকারীভাকে পর্ণো সাইটগুলো বন্ধ করতে হবে।
অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিউজ নারায়ণগঞ্জের সম্পাদক শাহজাহান শামীম বলেন- প্রশাসন, সাংবাদিক ও অভিভাবকদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। কার্যকর কোন পদক্ষেপ না নিলে এগুলো বন্ধ করা যাবেনা। সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিলে এসব অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব। মনিটরিং কমিটিতে স্থানীয় নারী প্রতিনিধি, নারী পুলিশ, নারী শিক্ষক, নারী সাংবাদিক রাখা উচিৎ। যাতে মেয়েরা সবকিছু সহসায় প্রকাশ করতে পারে। অভিযুক্ত শিক্ষকদের লিস্ট করে চিরজীবনের জন্য শিক্ষকতা নিষিদ্ধ করতে হবে। মাদ্রাসাগুলো আবদ্ধ পরিবেশের হওয়ায় অনেক বলৎকারের ঘটনাই বাইরে প্রকাশ হয়না। এগুলো নিয়েও কাজ করা দরকার। কেননা অপরাধগুলো বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে।
দৈনিক জনকন্ঠের জেলা প্রতিনিধ সাংবাদিক মোঃ খলিলুর রহমান বলেন, বিগত কয়েকদিনে নারায়ণগঞ্জে স্কুল ও মাদ্রাসায় দুটি লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে। যা আমাদের সমাজ ও দেশের জন্য খুবই লজ্জাকর। আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। পিতার সমতুল্য শিক্ষকের কাছেই এমন জঘন্যতম ঘটনা মেনে নেওয়ার মত নয়। এমন সমস্যা দূর করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব নেওয়া উচিৎ। দায়দায়িত্ব অভিভাবকদেরও নিতে হবে। ছেলে-মেয়েরে খোজখবর নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা উচিৎ। এছাড়া সমাজের সবাইকে নৈতিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা মহানগর হেফাজ ইসলামের মহাসচিব মাওলানা ফেরদাউস রহমান বলেন, প্রায়ই দেখা যায় মা-বোনেরা বেপর্দায় রাস্তায় চলাফেরা করে। বর্তমানে ধর্মের চর্চা কমে যাওয়ায় এ ধরনের অপরাধ বেড়ে গেছে। সরকারী মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রীকে একসাথে বসে ক্লাস করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন মসজিদ এবং মাদ্রাসা শিক্ষক ছাত্রীদেরকে যৌন হয়রানি করছে, এটা সত্যিকার অর্থেই আমাদের জন্য দুঃখজনক ব্যাপার এবং সবচেয়ে লজ্জাজনক। একজন শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী কীভাবে ধর্ষিত হতে পারে? আজকে আমরা এখানে বসে শিক্ষক নিয়ে সমালোচনা করছি, এটা কখনও কল্পনা করতে পারিনি। আমাদের সচেতনতা সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।
মজিব ফ্যাশনের এমডি মাহমুদুর রহমান বলেন, আগে এই অপরাধের প্রবণতা গার্মেন্টেসে ছিল। গার্মেন্টস মালিকদের তৎপরতায় এই অপরাধ এখন বন্ধ হয়েছে। যা পরবর্তীতে শুরু হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বিকৃত মানুষরাই এ অপকর্মে লিপ্ত হয়।
মিজমিজি পশ্চিম পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, সরকারের কাছে এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা আছে। যা অস্বীকৃত শিক্ষকদের নেই। স্বীকৃতি বহির্ভূত এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যেই গড়ে তোলা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানেই অস্বীকৃত শিক্ষরা এমন অপকর্ম করে থাকে। এমন কোচিং সেন্টারগুলোতেই এমন ঘটনা ঘটে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ণ বোর্ড উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশেদুল মতিন মিল্টন বলেন, সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে। তাদের মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে অভিভাবকদেরকে। যা এসব অপরাধের অন্যতম কারণ।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও যুগান্তরের সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি হোসেন চিশতী সিপলু বলেন, অসুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তিরাই ধর্ষণের মত এমন ঘৃণ্য কাজ করতে পারে। তাদেরকে আমি শিক্ষক বলতে নারাজ। তিনি আরো বলেন, দেশের অভিভাবক সমাজ আতঙ্কিত। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা প্রেস ক্লাবের সকল সাংবাদিকও আতঙ্কিত। সেই আতঙ্ক থেকেই আমাদের এই আয়োজন। এমন আয়োজনেই মাধ্যমে আজকের এই পরিস্থীতির পরিবর্তনই আমাদের স্বার্থকতা।

1