রাষ্ট্র যখন অপরাধের অংশিদার-তৈমূর

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ  আধুনিক অপরাধ বিজ্ঞানীরা সচরাচর সংগঠিত অপরাধ (ঈড়হাবহঃরড়হধষ ঈৎরসব) এর পরও অপরাধ প্রবনতাকে আরও তিনটি স্তরে (যা দ্বারা আইন ভঙ্গ হয়ে থাকে) বিন্যাস করেছেন। যেমন (১) সন্ত্রাস (ঞবৎৎড়ৎরংস), (২) যেখানে অপরাধী ধরা ছোয়ার বাহিরে থাকে (ডযরঃব পড়ষষড়ৎ পৎরসব) ও (৩) সংঘবদ্ধ অপরাধ (ঙৎমধহরুবফ ঈৎরসব)।

সংঘবদ্ধ অপরাধের পরিপূর্ণ কোন সংঙ্গা প্রদানে অপরাধ বিজ্ঞানী বা আদালত এখন পর্যন্ত ঐক্য মতে পৌছতে পারে নাই। আমেরিকার সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি চড়ঃঃবৎ ঝঃবধিৎঃ বলেছেন যে, “সংঘবদ্ধ অপরাধ কি সুনির্দিষ্টভাবে আমি ব্যাখ্যা করতে পারবো না, তবে যখন অপরাধটি জানতে পারি তখন আমি বুঝতে পারি।” সংঘবদ্ধ অপরাধ (ঙৎমধহরুবফ ঈৎরসব)-কে সংঙ্গায়িত করার জন্য ১৯৮০ ইং সনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জড়হধষফ জবধমধহ একটি কমিশন গঠন করেন, কিন্তু উক্ত কমিশন আলোচনা পর্যালোচনার পর “সংঘবদ্ধ অপরাধ” সংঙ্গায়িত করে নাই বা করতে পারে নাই। তবে তাদের মতে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ সংগঠিত হওয়ার জন্য তিনটি গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, যথা- (১) একটি অপরাধী চক্র, (২) প্রটেকশন দেয়ার জন্য একটি গ্রুপ (চৎড়ঃবপঃড়বৎ), (৩) বিশেষজ্ঞ সমর্থক (ঝঢ়বপরধষরংঃ ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ).

সংঘবদ্ধ অপরাধের উপর ১৩ জন অপরাধ বিজ্ঞানী প্রনীত তথ্যমূলক বই পর্যালোচনা করে অন্যতম অপরাধ বিজ্ঞানী ঋৎধহশ ঐধমধহ একটি সংঙ্গা তৈরী করেছেন যাতে তিনি বলেছেন যে, “ঞযবৎব রং মৎবধঃ পড়হংবহংঁং রহ ঃযব ষরঃবৎধঃঁৎব ঃযধঃ ড়ৎমধহরমধবফ পৎরসব ভঁহপঃরড়হং ধং ধ পড়হঃরহঁরহম বহঃবৎঢ়ৎরংব ঃযধঃ ৎধঃরড়হধষষু ড়িৎশং ঃড় সধশব ঢ়ৎড়ভরঃ ঃযৎড়ঁময রষষরপরঃ ধপঃরারঃরবং ধহফ ঃযধঃ রং বহংঁৎবং রঃ’ং বীরংঃবহপব ঃযৎড়ঁময ঃযব ঁংব ড়ভ ঃযৎবধঃং ড়ৎ ভড়ৎপব ধহফ ঃযৎড়ঁময ঈঙজজটচঞওঙঘ ঙঋ চটইখওঈ ঙঋঋওঈওঅখঝ ঃড় সধরহঃধরহ ধ ফবমৎবব ড়ভ রসসঁহরঃু ভৎড়স ষধি বহভড়ৎপবসবহঃ.” ঋৎধহশ ঐধমধহ এর মতে চঁনষরপ ড়ভভরপরধষ অর্থাৎ জনগণের অর্থে লালিত পালিত রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের সহযোগীতার মাধ্যমেই সংঘবদ্ধ অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।

অপরাধ বিজ্ঞানীগণ আরো মনে করেন যে, “ঈৎরসবং নু পড়ৎঢ়ড়ৎধঃরড়হং (রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিধি বদ্ধ সংস্থা) ফঁৎরহম ঃযব পড়ঁৎংব ড়ভ নঁংরহবংং, ড়ৎ পৎরসবং নু ঢ়ড়ষরঃরপরধহং ড়ৎ মড়াবৎসবহঃ ধমবহপরবং, পধহ ধষংড় নব পড়হংরফবৎবফ ঢ়ধৎঃ ড়ভ “ঙৎমধহরুবফ” পৎরসব. ঋড়ৎ ঊীধসঢ়ষব, ড়ভভরপরধষ সরংপড়হফঁপঃ নু ধ মাবৎহসবহঃ ড়ভভরপরধষ, ড়নংঃৎঁপঃরড়হ ড়ভ লঁংঃরপব ধহফ পড়সসবৎপরধষ নৎরনবৎু ধৎব ধষষ ঃুঢ়বং ড়ভ ড়ৎমধহরুবফ পৎরসব নবযধৎরড়ঁৎ.” রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা দায়িত্ব পালনে সংঘবদ্ধ অপরাধে জাড়িয়ে পড়ে। বিচার ব্যবস্থা প্রতিবন্ধকতা (ড়নংঃৎহপঃরড়হ) সৃষ্টি করাকেও অপরাধ বিজ্ঞানীরা সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্šÍরভুক্ত মনে করেন। সরকারের বা ক্ষমতাসীনদের চাহিদা মোতাবেক রায় প্রদান বা বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রদান করা বা বিচারিক যে সিদ্ধান্তে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সরকার লাভবান হয় তাহাও সংঘবদ্ধ অপরাধের আওতায় আসে। এখন প্রশ্ন হলো বিচার বিভাগ যদি লাইনচ্যুত হয়ে অপরাধী চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে তখন ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কাহার উপর বর্তাইবে?

জনস্বার্থে আইন প্রনয়ন এবং এর সুষ্ঠ প্রয়োগই একটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাষ্ট্রের পক্ষে এ দায়িত্ব পালিত হয় জনগণের বেতন ভুক্ত কর্মচারীদের মাধ্যমে। অথচ এ কর্মচারীদের কর্মকান্ডে আইনভঙ্গের পৃষ্ঠপোষকতা হচ্ছে বিধায় অপরাধ বিজ্ঞানীরা সচরাচর অপরাধ, হোয়াইট কালার অপরাধ, সন্ত্রাসবাদী অপরাধের পাশাপাশি নতুন করে একটি অপরাধকে নিয়ে গবেষনা করছেন যে অপরাধ খালি চখে দেখা যায় না, পক্ষান্তরে রাষ্ট্র ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্থ হয় বিভিন্ন ভাবে। রাষ্ট্র যন্ত্রের পরিচালক বা নিয়ন্ত্রনকারী প্রতিষ্ঠান “সরকার” লাভবান হলেও ভিকটিম হয় জনগণ পক্ষান্তরে রাষ্ট্র।

প্রায় ৩০০ বৎসর পূর্বে ইটালীর প্রখ্যাত মনস্তাত্ববিদ ও আইন বিশেষজ্ঞ ঈবংধৎব ইধপপধৎরধ বলেছেন যে, “ঝড়সব ঃরসবং ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব নবপধসব ঃযব ারপঃরসব ড়ভ ষধ”ি অর্থাৎ “আইন দ্বারা জনগণ ভিকটিম ক্ষতিগ্রস্থ হয়” (যে আইন জনস্বার্থে প্রনীত না হয়ে শাসকদের রক্ষার্থে প্রনীত হয়ে থাকে)। আমেরিকার ঘধঃরড়হধষ অফারংড়ৎু পড়সসরঃঃবব ড়হ ঈৎরসরহধষ ঔঁংঃরপব ধহফ মড়ধষং হোয়াইট কালার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মধ্যে কোন প্রকার তারতম্য খুজে না পেয়ে বরং এ মর্মে মন্তব্য করেছেন যে, ঞযবৎব ধৎব সড়ৎব ংরসরষধৎরঃরবং ঃযধহ ফবভভবৎবহপবং নবঃবিবহ ড়ৎমধহরুবফ পৎরসব (সংঘবদ্ধ অপরাধ) ধহফ ংড়-পধষষবফ যিরঃব পড়ষষধৎ পৎরসব. তবে সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মধ্যে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা যে তারতম্য খুজে পেয়েছেন তা হলো সন্ত্রাসবাদের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক ফয়দা লুটার উদ্দেশ্য আদর্শ ভিত্তিক লড়াই যা করার জন্য রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনকে ভঙ্গ বা অমান্য করা হয়। অন্যদিকে সংঘবদ্ধ অপরাধের উদ্দেশ্যে আইনকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অর্থনৈতিক ফয়দা হাসিল করা। সরকার, রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও অপরাধী চক্র একই সাথে একই উদ্দেশ্যে কাজ না করলে সংঘবদ্ধ অপরাধ (ঙৎমধহরুবফ ঈৎরসব) সংগঠিত করা সম্ভব হয় না।

জাতীয় পত্রিকার ভাষ্যমতে সম্প্রতি শেয়ার বাজার থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়েছে। কিন্তু কাউকে দোষী সাবস্ত করে এখন পর্যন্ত বিষয়টি আইনের আওতায় আনা হয় নাই। সরকার ও রাষ্ট্র যন্ত্র যদি এ অপরাধে জড়িত না থাকে তবে এ ধরনের অপরাধ সংগঠিত হয় কি ভাবে ? ইতোপূর্বেও শেয়ার বাজার থেকে অনুরূপভাবে মোটা দাগে অর্থ উধাউ হয়েছিল, শুনা গিয়ে ছিল যে তদন্ত করা হবে, কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আজ পর্যন্ত সূর্যের আলো দেখে নাই। যেখানে সংঘবদ্ধ অপরাধ (ঙৎমধহরুবফ ঈৎরসব) সংগঠিত হয় সেখানে অপরাধী ধরা না পরারই কথা। কারণ যারা অপরাধী সনাক্ত ও বিচার করবে তারাই বা তাদের উপরওয়ালারা যদি জড়িত থাকে তবে অপরাধী সনাক্ত বা বিচার হবে কি ভাবে?

মোট অংকের ব্যাংক ঋণ (খড়ধহ ঝযধৎশরহম) মঞ্জুরের ক্ষেত্রেও বড় আকারের সংঘবদ্ধ অপরাধ সংগঠিত হয়ে আসছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, যাহাতে প্রতারক ঋণ গৃহিতা, ব্যাংকের উচ্চপদস্থ আমলা এবং সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের প্রভাব জড়িত থাকে। দেশীয় কাচামালের উত্তম ব্যবহার, বেকারদের কর্মসংস্থান, উৎপাদিত দ্রব্য রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা উর্পাজনের উদ্দেশ্যেই জনগণের গচ্চিত অর্থ থেকে শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য মোটা অংকের ব্যাংক ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু শিল্প কারখানাকে পরবর্তীতে রুগ্ন শিল্প দেখিয়ে একদিকে সুদের অর্থ মওকুফ, অন্যদিকে অল্প মূল্যে সম্পত্তি ব্যাংকের নামে বন্ধক রেখে মোটা দাগের যে ঋণ নেয়া হয় তাতে সে সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ব্যাংক সম-পরিমাণ অর্থ আদায় করা দূরের কথা ঋণ গৃহিতাদের টিকিটি ধরতেও হিমসিম খেতে হয়। জাহালমের মোটা অংকের ব্যাংক ঋণ সংঘবদ্ধ অপরাধের একটি চিত্র যাকে মাইল ফলক হিসাবে চিহ্নিত করে সরকার ব্যাংক ঋণ সেক্টরের জাল জালিয়াতি মূল উৎপাদানের সূযোগ গ্রহণের কথা ছিল, কিন্তু তা সম্ভব হয় নাই বরং জাহালমের কারা ভোগ হয়েছে, এর পিছনেও রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র যাদের হাতেই আইন, বিচার ও শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ।

সংঘবদ্ধ অপরাধের উপর গবেষনা করে গবেষক অঘউঊজঝঙঘ এ মর্মে মন্তব্য করেন যে, “ঞযবৎব রং ধ হববফ ভড়ৎ রহভড়ৎসধঃরড়হ ধনড়ঁঃ ড়ৎমধহরুবফ পৎরসব ধপঃরারঃু রঃ ংবষভ, নু যিরপয ঃযব এড়াবৎহসবহঃ হবি ষবমরংষধঃরড়হ ধহফ রঃং বীঢ়ধহফরহম ষবাবষ ড়ভ বভভড়ৎঃ পধহ নব বাধষঁধঃবফ” অর্থাৎ অহফবৎংড়হ মনে করেছেন যে, সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সরকারের জানা থাকা অত্যান্ত প্রয়োজন যাহাতে এর প্রসার রোধ কল্পে সরকার যথাযথ আইন প্রনয়ন করতে পারে। বাম রাজনীতির অন্যতম প্রবক্তা মার্ক্স মনে করতেন যে, ভোগবাদী সমাজের কারণে এক শ্রেণী উচ্চ বিলাশী হয় বিধায় গণমানুষ হয় ক্ষতিগ্রস্থ যার ফলে সম্পদের সুষম বন্টন হতে পারে না, ফলে মানুষের মধ্যে শোষক ও শোষিতের শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছে। শোষক শ্রেণীরাই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার জন্য লোক দেখানো ও জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য মূখে মূখে যত নীতি কথা প্রচার করুক না কেন তাদের মূল উদ্দেশ্যই থাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে বিজ্ঞ বৈভবের মালিক হয়ে রাম রাজত্বে অধিষ্ঠিত থাকা। একটি রাষ্ট্রে ঙৎমধহরুবফ ঈৎরসব অর্থাৎ সংঘবদ্ধ অপরাধ ছাড়া অবৈধভাবে মোটা দাগে অর্থনৈতিক লাভ সংক্রান্ত কোন অপরাধ সংগঠিত হতে পারে না। এদের হাত অনেক লম্বা বিধায় নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারের মতবিরোধ দেখা না দিলে তারা বিচারের আওতায় আসে না, যদিও আসে তা অতান্ত কাদাচিত। জনগণের চাপে বা সমাজে ভারসাম্য রক্ষার জন্য যতই আইন প্রনীত হউক না কেন সে আইনের মূল উদ্দেশ্য হত্যা হয় উচ্চ বিলাশী আইন প্রনেতা ও প্রয়োগকারীদের হাতেই। ফলে সমাধানের বা সম্পদের সুষম বন্টনের কোন সিলভার লাইন পরিলক্ষিত হয় না। জনগণ যে তিমিরে সে তিমিরেই থেকে যায়। যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় কোরবানীর চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুতে রাখার সংবাদ পত্রিকায় চাওর করেই প্রকাশিত হয়েছে। সরকার বলেছে যে, চামড়ার মূল্য কমে যাওয়ার পিছনে কোন সিন্ডিকেট কাজ করেছে, তা খোজে দেখা হচ্ছে। সরকারের ভিতরে থাকা সরকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগীতা ছাড়া সিন্ডিকেট তৈরী হতে পারে না। সংঘবদ্ধ অপরাধের জন্যই সিন্ডিকেট সৃষ্টি হয়ে থাকে যারা অত্যান্ত প্রভাবশালী। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষনা দিলেও অনুরূপ কারনেই মাদকের প্রসার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু সরিষায় যদি ভুত থাকে তবে সে ভুত তাড়াবে কে?

1