জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ ও খালেদা জিয়ার শর্তসাপেক্ষে মুক্তি– আতিক আজিজ

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:  ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহারে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয় নভেল করোনা ভাইরাস। এরই মধ্যে বিশ্বের অন্তত ১৯৬টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই মরণব্যাধি। বিশ্বজুড়ে এতে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ, মারা গেছেন ২০ হাজার ৪৯৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ১২১ জন চিকিৎসার মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করেছেন।
দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ বুধবার সকালে ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। করোনায় ওই ব্যক্তির ডায়াবেটিস ও হাইপার টেনশনের সমস্যা ছিল। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কারো শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায় নি।
বুধবার সরকারের রোগতত্ত্ববিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) দায়িত্বাধীন পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা করোনার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা ওই ব্যক্তির শরীরে গত ১৮ মার্চ করোনার উপস্থিতি ধরা পড়ে। তিনি বিদেশফেরত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন বলে তখন জানা যায়। এ সময় তাকে এলাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে গত ২১ মার্চ রাজধানীর কোভিড-১৯-এর চিকিৎসার জন্য সরকার নির্ধারিত কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
এ সময় আরো জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮২ জনের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেই করোনায় আক্রান্ত নন। এই ৮২ জনসহ এখন পর্যন্তন মুনা পরীক্ষা করা হলো মোট ৭৯৪ জনের। বর্তমানে আইসোলেশন আছেন ৪৭ জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন আরো ৪৭ জন। সম্প্রতি আক্রান্তদের মধ্যে দুই জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাদের শরীরে এখন আর করোনার সংক্রমণ নেই। এ নিয়ে মোট সাতজন সুস্থ হলেন।
করোনা ভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় ইতালিতে মারা গেছেন আরও ৬৮৩ জন। এ নিয়ে সেখানে করোনায় প্রাণ হারালেন মোট ৭ হাজার ৫০৩ জন। এদিন ইতালিতে নতুন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছেন আরও ৫ হাজার ২১০ জন। ফলে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৩৮৬ জন।
ইউরোপের দেশটিতে এপর্যন্ত ৯ হাজার ৩৬২ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। এখনও চিকিৎসাধীন ৫৭ হাজার ৫২১ জন। এদের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।
বিশ্বজুড়ে এতে আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ, মারা গেছেন ২০ হাজার ৪৯৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ১২১ জন চিকিৎসার মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করেছেন।

২. বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জাতির উদ্দেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে বিশেষ করে- সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাস মোকাবেলাকে এবারের সংগ্রাম ঘরে থাকা এবং অতি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকা. গুজব রটনাকারী ও পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি. গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা, অতিরিক্ত কোন ভোগ্যপণ্য না কিনা এবং মজুদ না করা, মহামারী আকারে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এই করোনাভাইরাস সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা এবং দেশবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে থাকার উদাত্ত আহ্বান, করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জন্য ঢাকায় ৬টি হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণে আরো বলেন, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের জন্য আরও ৩টি হাসপাতাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের জন্য পৃথক শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকায় ১০ হাজার ৫০টিসহ সারাদেশে ১৪ হাজার ৫৬৫টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সারাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য ২৯০টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নি¤œআয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’ কর্মসূচীর আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা, নি¤œ-আয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য বিত্তবানদের প্রতি আহ্বানও জানান। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনসহ সকল জেলায় শিশু সমাবেশ ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা , কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী জুন মাস পর্যন্ত কোন গ্রাহককে ঋণ খেলাপী না করার ঘোষণা দিয়েছে রলেও উল্লেখ করেন।। রফতানি আয় আদায়ের সময়সীমা ২ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় মেটানোর সময়সীমা ৪ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। মোবাইলে ব্যাংকিং-এ আর্থিক লেনদেনের সীমা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুত, পানি এবং গ্যাস বিল পরিশোধের সময়সীমা সারচার্জ বা জরিমানা ছাড়া জুন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা, এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। প্রায় ২২ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের নানা উদ্যোগ, এই ভাইরাস থেকে নিজেদের রক্ষায় দেশবাসীকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি গত ১০ বছরে দেশের উন্নয়ন-সাফল্যগুলো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। উক্ত জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারী টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণ সরাসরি প্রচার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণটি নিঃসন্দেহে বলা যায়, সময়োপযোগি, তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ। তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণের মর্মার্থ যদি সংশ্লিষ্ট মাননীয় মন্ত্রীমহোদয, সাংসদবৃন্দ, সচিবগণ তথা সচেতন নাগরিকবৃন্দ বুঝে যার যার অবস্থান থেকে পালন করেন তবেই ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাসকে তথা নি¤œ আয়ের মানুষ, মধ্যবিত্ত মানুষদের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য মজুদ না করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা জনগণের সরকার। সব সময়ই আমরা জনগণের পাশে আছি। আমি নিজে সর্বক্ষণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি। আমাদের এখন কৃচ্ছ্র সাধনের সময়। যতটুকু না হলে নয়, তার অতিরিক্ত কোন ভোগ্যপণ্য কিনবেন না। মজুদ করবেন না। সীমিত আয়ের মানুষকে কেনার সুযোগ দিন। আর দুর্যোগের সময়ই মনুষ্যত্বের পরীক্ষা হয়। এখনই সময় পরস্পরকে সহায়তা করার; মানবতা প্রদর্শনের। তাই দেশবাসীকে আবারও বলছি; স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সকলে যার যার ঘরে থাকুন, ভাল থাকুন, সুস্থ ও নিরাপদে থাকুন।
ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য মজুদ যেনো না করতে পারে তার জন্য প্রতিটি থানায় এমনকি প্রতিটি ওয়ার্ডে ভ্রাম্যমান আদালত টিম বাড়াতে হবে। স্থানীয় থানা প্রশাসনকে আরো জোড়ালো ভূমিকা রাখার জন্য না করার ঠোর নির্দেশনা দিতে হবে। মনে বাখতে হবে ব্যবসায়ীদেও কোন দল নেই। দুর্যোগের সময়ই কতিপয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে সরকারের সুনাম ক্ষুন্ন করে। নি¤œ আয়ের মানুষ, নি¤œ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত লোকদের জিম্মি করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এই সব কতিপয় মুনাফাখোর, মজুদদারদেও সিন্ডিকেট ভাংতে হলে বিভিন্ন গোয়েন্দা বিভাগ বা সেনাবাহিনীর উপর দায়িত্ব দিতে হবে। তাহলেই নি¤œ আয়ের মানুষ, নি¤œ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত লোকজনের মাঝে স্বস্থি আসবে এবং জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ সার্থক হবে।
দেশে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য মজুদ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এবছর রোপা আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারী গুদামগুলোতে ১৭ লাখ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এছাড়া বেসরকারী মিল মালিকদের কাছে এবং কৃষকদের ঘরে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ আছে। চলতি মৌসুমেও আলু-পেঁয়াজ-মরিচ-গমের বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই খাদ্য মজুদ করবেন না। আর কৃষক ভাইদের প্রতি অনুরোধ, কোন জমি ফেলে রাখবেন না। আরও বেশি বেশি ফসল ফলান
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নি¤œআয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’ কর্মসূচীর আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভাষানচরে ১ লাখ মানুষের থাকার ও কর্মসংস্থান উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কেউ যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে। একইভাবে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা ও দেয়া হচ্ছে বলেও তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন।
নি¤œআয়ের ব্যক্তিদের, গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। অথচ বাংলাদেশে যারা চাকরিজীবী নি¤œ মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত করোনায় সবাই সঙ্কটে আছেন তাদেও জন্য প্রধানমন্ত্রী তেমন কোন ঘোসণা দেননি। অনেক চাকরিজীবী নি¤œ মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবার বা লোকজন আছেন যারা অনেবক কষ্টে দিন যাপন করছেন। তাদেরকে সহজে কেউ সহযোগিতা করেন না, ক্ষুদ্র ঋৃণও কোন এনজিও দিতে চান না। তাদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশী। সারা মাস পরিবার পরিজনের খাবার, পোষাক, সন্তানদের বিভিন্ন খরচ চালিয়ে বাসা ভাড়া দিতে হিমশিম খেতে হয়্। বাড়ির মালিকদের সঠিক সময়ে ভাড়া না দিতে পারলে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়। বাংলাদেশে যারা চাকরিজীবী নি¤œ মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত লোকজন আছেন তাদেও জন্য করোনার এ সংকটময় সময়ে তাদেরকে অন্তত বিদ্যুৎ বিল ও গ্যাস বিল ব্যতীত তিন মাসের বাসাভাড়া মওকুফ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরি।

৩. দীর্ঘ দুই বছরেরও অধিক সময় কারাগারে বন্দি থাকার পর অবশেষে গত ২৫ মার্চ বুধবার দুই শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়েছেন দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। মুক্তির পর তাকে গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ৭৭৫ দিন পর ফিরোজায় ফিরলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে মানবিক কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন হাইকোর্টের আইনজীবী। মঙ্গলবার সকালে ডাকযোগে আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এই আবেদন পাঠান।
এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার দ-াদেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘কিছুদিন আগে খালেদা জিয়ার ভাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি দরখাস্ত এবং আমার কাছে একটি দরখাস্ত করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেওয়ার জন্য। সেখানে তিনি লন্ডনে উন্নত চিকিত্সা করানোর কথা বলেছিলেন। এরপর খালেদা জিয়ার ভাই শামীম ইস্কান্দার, বোন সেলিমা ইসলাম, বোনের স্বামী রফিকুল ইসলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই বিষয়ে সাক্ষাত্ করেছিলেন। সেখানেও এই আবেদনের ব্যাপারে তারা কথা বলেছিলেন। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেছিলেন নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।
বয়স ও মানবিক বিবেচনায় শর্ত সাপেক্ষে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছয় মাসের জন্য মুক্তি পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাহী আদেশে শর্ত সাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মুক্তির শর্ত হিসেবে বাসায় অবস্থান করতে হবে খালেদা জিয়াকে। চিকিৎসা নিতে হবে দেশেই। সাজা স্থগিতকালীন ছয় মাস তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না।
জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদ- নিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি ছিলেন খালেদা জিয়া।
মুক্তির ঘোষণা শোনার পর থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল হাসপাতাল এলাকায় নেতাকর্মীদের ভিড় বেড়ে যায়। করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার বয়স ও মানবিক বিবেচনায় সরকার তাকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শর্ত সাপেক্ষে তাকে ৬ মাসের জন্য মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তার বোন সেলিমা ইসলাম। বিএনপি ও তার সহযোগি বিভিন্ন অংগ সংগঠনের নেতা কর্মীরা খুশি হলেও তেমন একটা খুশি হতে পারেননি কতিপয় কিছু সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তে সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেলে সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানানোর এমন তথ্যের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এ কথা বলেন তিনি। রিজভী বলেন, আমরা মনে করি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে যে কারণে সাজা দেয়া হয়েছে তার কোনো ভিত্তি ছিল না, তার সার্বত্ত ছিল না। আজকে সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে, এটাকে আমরা মনে করি এটা একটা ইতিবাচক দিক। খালেদার জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তের পর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিলেন রিজভী। সেখানেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। যেখানে মানবিক দিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দুই শর্তে তাকে মুক্তি দেয়ার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তবিক ধন্যবাদ দেয়ার দরকার ছিল্।ো মন্দকে মন্দ, আর ভালোকে ভালো বলা এখনো শিখেননি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর মতো বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাই। যার ফলে আজকে বিএনপি’র চরম দূরাবস্থা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এদিকে, খালেদা জিয়ার মুক্তির এ খবরটি স্বস্তির উল্লেখ করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মঙ্গলবার বিকাল ৫টা ১৭ মিনিটে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। সরকারকে স্বাগত জানিয়ে স্ট্যাটাসে ড. আসিফ নজরুল লিখেছেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। সাজা স্থগিত রেখে তাকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই, সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি লিখেন, বেগম জিয়ার মরণাপন্ন অবস্থা হয়েছে বলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিনা- এনিয়ে সমাজে সন্দেহ থাকতে পারে। এমন ধারণাও থাকতে পারে যে করোনা পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আসিফ নজরুল লিখেন, যে বিবেচনায় উনি (খালেদা জিয়া) সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পাচ্ছেন। একই বিবেচনায় কেন উনি জামিন পাননি কিছুদিন আগেও- এই প্রশ্নও তুলতে পারে কেউ।
তিনি আরও লিখেন, আমি তবু সরকারের এ সিদ্ধান্ত স্বাগত জানাই। কারণ উনার (খালেদা জিয়া) মুক্তির পেছনে যে বিবেচনা থাক না কেন, মুক্তির সিদ্ধান্তটি বেগম জিয়ার জন্য ভালো। আমাদের নেতা-নেত্রীরা একে অন্যের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নিলে তা দেশের জন্যও ভালো। বেগম জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। কামনা করছি বড় দুদলের সম্পর্কেও সুস্থতার। খালেদা জিয়ার পরিবার থেকে, অধ্যাপক আসিফ নজরুলের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে সাজা স্থগিত রেখে তাকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে পারেন , সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে পারেন, তাহলে কতিপয় বিএনপির সিনিয়র নেতাগণ, তথাকথিত বিএনপির ঘরোয়ানা শতাধিক বুদ্ধিজীবী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শর্তসাপেক্ষে মুক্তির ব্যাপারে নিশ্চুপ কেনো? সরকারকে ধন্যবাদ দিতে তারা এতো কৃপনতা করছেন কেনো? তাহলে কি বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছেন না? এ প্রশ্ন আজ ঘুরপাক খাচ্ছে বুদ্ধিজীবী মহলে।
মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আইনমন্ত্রীর ঘোষণার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল থেকে বের হন খালেদা জিয়া। সেখান থেকে তিনি সরাসরি খালেদা জিয়াকে ঢাকা মেট্রো-ভ ১১-০৬৯২ নিশান পেট্রল গাড়িতে নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ পরিবার সদস্যরা বিএসএমএমইউ হাসপাতাল থেকে গুলশানের নিজ বাসভবন ফিরোজার উদ্দেশে রওনা দেন। সঙ্গে চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পাঁচটি গাড়ি ও মাইক্রোবাসও ছিল। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় ঠেলে যেতে অনেক বেগ পেতে হয় খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে। সরকারি এ সিদ্ধান্ত জানার পর থেকে বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী ও খালেদা জিয়ার পরিবার তার মুক্তির অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটল।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ১৭ বছরের কারাদ- মাথায় নিয়ে কারাবন্দি খালেদা জিয়া গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীনছিলেন।
বুধবার বিকাল ৫টা ১৬ মিনিটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর রোডের
এরও আগে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিতের আবেদনের ফাইলে স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দন্ডের কার্যকারিতা স্থগিত করে মুক্তির আদেশের নথি প্রধানমন্ত্রীর দফতর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারা কর্তৃপক্ষের হাত ঘুরে বুধবার বিকাল ৩টার পর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পৌঁছায়।
মঙ্গলবার বিকালে হঠাৎ করেই ডাকা সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়াকে মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দুই শর্তে তাকে (খালেদা জিয়া) মুক্তি দেয়ার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। খালেদা জিয়া বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশ যেতে পারবেন না- এমন শর্তে তাকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
দেশবাসীকে করোনাভাইরাসের মহামারীতে সাবধান ও সচেতন থাকতে বলেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
বুধবার সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর রোডের বাসভবন ফিরোজায় তার সঙ্গে দলের শীর্ষ ৭ নেতা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান দেখা করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন।
সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ফখরুল বলেন, আমরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। এ সময় চিকিৎসার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যেহেতু করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে- এমন অবস্থায় অন্তত কিছুদিন উনার (খালেদা জিয়া) কোয়ারেন্টিনে থাকার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কেউ যেন উনার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে না পারে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই সময়ে তার সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
বিএনপি চেয়ারারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার নিজ বাসায় কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার (২৫ মার্চ) সন্ধ্যায় ‘ফিরোজা ভবনে’ সদ্য মুক্তি পাওয়ায় বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা ম্যাডামকে জানাতে এসেছি, আমরা ওনার মুক্তিতে অনেক খুশি হয়েছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, উনি যেন এখান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেন। আবার রাজনীতিতে আসতে পারেন, সেই কথাগুলো বলেছি। ওনার চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা ইতিমধ্যে ওনার বাসায় গিয়েছেন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। আপাতত কিছুদিনের জন্য ম্যাডামকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে।’
জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদন্ড নিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি ছিলেন খালেদা জিয়া। প্রথমে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও গত বছর ১ এপ্রিল থেকে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা রয়েছে। দুটি বাদে সব মামলায় তিনি জামিনে আছেন।
বিএনপিনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রেক্ষিতে বিএনপির উচিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুরকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার এই উদারতা ও মহানুভবতার কারণে বিএনপি নেতিবাচক এবং ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে ফিরে এসে তথাকথিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ করা। বিরোধীদল হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন করা। সরকার জনগণের স্বার্থপরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে সরকারের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায় করা। বিরোধীতার খাতিরে বিরোধিতা না করে সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করা। বিএনপি’র আভ্যন্তরিন দ্বন্ব নিরসন করে দলকে সুসংগঠিত করা। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের সঙ্গে, একযোগে জনগণের পাশে থেকে কাজ করা । ###

1