৪২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি সবচেয়ে কম

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:  ৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি সবচেয়ে কম। আন্তর্জাতিক এক পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, এখানে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে মোবাইলে ইন্টারনেটের গতি কমে গেছে। ৪২টি দেশের ওপর চালানো পর্যবেক্ষণে এ কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশেই ডাউনলোডের গতি সবচেয়ে কম। এর জবাবে মোবাইল অপারেটররা বলছে, সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার ফলে ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণ আগের চেয়ে অধিক পরিমাণ মোবাইল ডাটা ব্যবহার করছে। এ কারণে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় তাদের পক্ষে উন্নততর ইন্টারনেট সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হংকং ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মোবাইল সেবা বিষয়ক বিশ্লেষণী সংগঠন ওপেনসিগন্যাল ওই পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটে ডাউনলোড গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ৯.৩ এমবি। কিন্তু মার্চের শেষ সপ্তাহে তা কমে এসেছে ৭.৮ এমবিতে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আস্তে আস্তে ইন্টারনেটের গতি কমতে শুরু করে বাংলাদেশে। বিশ^জুড়ে মানুষ ইন্টারনেটের যে গুণগত মান ব্যবহার করছে তার প্রেক্ষিতে মোবাইল এপ্লিকেশনে গতি পরীক্ষা করে এসব তথ্য পেয়েছে ওপেনসিগন্যাল।
বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্তের রিপোর্ট নিশ্চিত করা হয় ৮ই মার্চ। ওই সময় ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি পায় উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও সরকারি দীর্ঘ ছুটি ঘোষণার পর এর ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ইন্টারনেটের সার্বিক গতিকে মূল্য দিতে হয়।
ওপেনসিগন্যাল এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা এবং উত্তর আমেরিকায় ২৭ শে জানুয়ারি থেকে ২৯ শে মার্চ পর্যন্ত ৪জি মোবাইল সেবার ডাউনলোড গতি বিশ্লেষণ করে। এতে দেখা যায়, ৪২ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে দুর্বল মানের ডাউনলোড গতি উপভোগ করছেন। এর ফলে ইন্টারনেট গতির একেবারে তলায় চলে আসে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গতি উপভোগ করেন কানাডার মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। সেখানে মোবাইল ইন্টারনেট গতি প্রতি সেকেন্ডে ৬১.৬ এমবি। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, এশিয়ায় মোবাইলে সর্বোচ্চ ইন্টারনেট গতি উপভোগ করছে দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে এই গতি প্রতি সেকেন্ডে ৫২.১ এমবি। এতে বলা হয়, এই কমতি মোবাইল ইন্টারনেট গতির কারণে বেশির ভাগ বাংলাদেশি গ্রাহক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এর মধ্যে মেডিকেল, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বিঘিœত হচ্ছে। কারণ, সব খাতই এখন ইন্টারনেট ভিত্তিক হয়ে গেছে।
এসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল এসএম ফরহাদ বলেছেন, আকস্মিকভাবে শহর এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামে চলে গেছেন। এর ফলে মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। অপারেটররা কম মূল্যে অধিক মোবাইল ডাটা অফার করছেন। এ অফারের ফলে দীর্ঘ সময় ভার্চুয়াল জগতে অবস্থান করতে বিপুল সংখ্যক গ্রাহক আকৃষ্ট হয়েছেন। উপরন্তু বহু মানুষ বাসায় বসেই অফিসের কাজ করছেন। শিক্ষার্থীরা অনলাইনে শিক্ষা নিচ্ছেন। বিনোদনের জন্য অধিক থেকে অধিক পরিমাণ মানুষ ইন্টারনেট ব্রাইজিং করছেন। এসব করতে অতিরিক্ত ডাটা খরচ হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমরা জানি বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে শতকরা কমপক্ষে ৯৫ ভাগই মোবাইল ডাটার ওপর নির্ভর করেন। এ জন্য অতিরিক্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রয়োজন। কিন্তু মানসম্পন্ন গতির জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয় অপারেটরদের। এসব মিলে ডাউনলোড গতি এতটা কম।
ওদিকে মোবাইল অপারেটররা বলছেন, বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিকভাবে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তারা ওইসব অংশে সঙ্কট মোকাবিলা করছে। এ চাহিদা মেটাতে তাদের সময় প্রয়োজন অথবা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে বাড়তি স্পেকট্রাম বসাতে হবে। এর প্রেক্ষিতে বাড়তি স্পেক্ট্রাম বসানোর অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে আবেদন করেছে তিনটি মোবাইল (অপারেটর। রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক এ কথা বলেছেন।
রবি, বাংলালিঙ্ক ও টেলিটক এ নিয়ে চিঠি লিখেছে বিটিআরসির কাছে। তাতে তিন মাসের মধ্যে কিছু স্পেক্ট্রাম অনুমোদন দেয়ার আবেদন করা হয়েছে। জহুরুল হক বলেছেন, অপারেটররা আবেদনে জানিয়েছেন, যদি তাদেরকে স্পেক্ট্রাম স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। এসব স্পেক্ট্রামের মূল্য কেমন হবে তার কোন উল্লেখ করেনি ওইসব অপারেটর। জহুরুল হক বলেন, এ ইস্যুতে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমার মনে হয় তাদের এমন দাবির যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
ওপেনাসিগনালের রিপোর্ট সম্পর্কে তিনি বলেন, মোবাইল ইন্টারনেটের গতির নাজুক অবস্থার জন্য স্পেক্ট্রামের ঘাটতি একটি কারণ। যদি এ সমস্যা সমাধান করা যায়, তাহলে মান উন্নত হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘোষিত নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়েও বেশি এখনও ৪জি অপারেটরদের গড় গতি। কিন্তু দেশে এখনও এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে অপারেটররা মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে পারছেন না। জহুরুল হক বলেন, সেবার অন্য পরিমাপকসহ গতি বিষয়ক টেস্ট চালিয়ে যাচ্ছে বিটিআরসি। যদি আমরা এক্ষেত্রে কারো অন্যায় বা ত্রুটি দেখতে পাই তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রবি এজিয়েটার করপোরেট প্রধান এবং রেগুলেটরি কর্মকর্তা শাহেদ আলম বলেন, করোনা ভাইরাস মহামারির প্রেক্ষিতে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এ সময় অপারেটররা প্রত্যক্ষ করেছে যে, লাখ লাখ মানুষ রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছেন। সাধারণত, এভাবে মানুষ গ্রামমুখো হন ঈদের ছুটির সময়। এমন সময়ে আমরা গ্রামীণ এলাকায় নেটওয়ার্ক সাপোর্ট দেয়ার জন্য আমাদের পরিকল্পনাকে নতুন করে সাজাই। কিন্তু এবার এই অনাকাঙ্খিত দলছুট হওয়ার ফলে অপারেটররা প্রস্তুতি নেয়ার কোন সময় পায় নি। যাতে নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক নিশ্চিত হয়।
শাহেদ আলম আরো বলেন, মানুষ যেহেতু ছুটিতে বাসায় অবস্থান করছে, তাই সাধারণ সময়ের তুলনায় ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা কমপক্ষে ৩০ ভাগ। এ সমস্যা সমাধানের একটি পথ হলো আমাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃতকরণ। কিন্তু তা করতে সময়ের প্রয়োজন হয়। সেই সময় এখন আমাদের হাতে নেই। এক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হলো, সরকার যদি আমাদেরকে বাড়তি কিছু স্পেকট্রামের অনুমতি দেয়, যেগুলো অলস পড়ে আছে। এটা করা হলে এই সঙ্কটের সময় আমরা গ্রাহকদের চাহিদা মিটাতে পারবো।
ওদিকে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইউজারর্স এসোসিয়েশন গতকাল সরকারে প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের বর্তমান সময়ে বিনামূল্যে স্পেক্ট্রাম অনুমোদন দেয়ার জন্য। এর ফলে গ্রাহকদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেয়া সম্ভব হতে পারে। এক বিবৃতিতে এই এসোসিয়েশন তাদের দাবি তুলে ধরে বলেছে, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে অনেক দেশই তার নাগরিকদের বিনামূল্যে টেলিযোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত করেছে। এ সংগঠনের প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের সরকারও উদ্যোগ নিতে পারে। অপারেটরদের বিনামূল্যে স্পেক্ট্রাম অনুমোদন দিলে গ্রাহকদেরও বিনামূল্যে সেবা দিতে পারবে অপারেটররা। এটা হলে জনগণকে ঘরের ভিতর রাখার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। করোনা মহামারির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনে কল কমে গেছে শতকরা ২০ ভাগ। তবে ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ২৫ ভাগ। এর ফলে অপারেটররা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

1