‘মানুষের সাথে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দূরত্ব বেড়েই চলছে, বিদেশমুখী হবার কারণ একই’

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টি ফোর ডটকম :  শুধু করোনাকাল নয়, সবসময়ই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে মানুষের দূরত্ব বেড়েই চলছে। নিজ দেশের স্বাস্থ্য সেবার উপর সাধারণ জনগণ আস্থা হারাচ্ছে, বিদেশমুখী হবার কারণও তাই, সাথে রয়েছে মিথ্যা প্রচারণা। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতের এক ওয়েবিনারে দেশের বিশিষ্ট সমাজসেবক এবং চিকিৎসকরা এই মত প্রকাশ করেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত সাপ্তাহিক এই অনুষ্ঠানে গতকালের আলোচনার মূল বিষয় ছিল- করোনার ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সৃষ্ট বিপর্যয় এবং তা থেকে উত্তরণের উপায়।

এতে আলোচক অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আলোচিত কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ যিনি ‘টিম খোরশেদ’ গঠন করে করোনাকালের শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দেবার পাশাপাশি লাশ সৎকারে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন। এছাড়াও ছিলেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল্লাহেল কাফি, ওই হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মােহাম্মদ আবুল হাসনাত। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র হেলথ স্পেশালিস্ট ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার।

করোনাকালে স্বাস্থ্যসেবার উপর মানুষের আস্থা হারানোর কারণ বলতে গিয়ে খোরশেদ বলেন, প্রথমেই বলতে হয় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবের কথা। নভেম্বরে চীনের উহান থেকে করোনা যেভাবে সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, সেক্ষত্রে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত বাংলাদেশেও যে তা দ্রুত চলে আসবে তা অনেকেই বুঝতে পারলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ শুরুতেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।
আর এই অনুধাবনের অভাবের কারণেই সংকটের শুরু। সরকার বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুরুতে চিকিৎসকদের ঠিকমতো নির্দেশনা দেয়নি। করোনা চিকিৎসার স্থান নির্ধারণ নিয়েও ছিল অব্যবস্থাপনা। যে কারণে অনেক প্রতিভাবান চিকিৎসক, দায়িত্ব পালনরত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যকেও জীবন দিতে হয়েছে। সাধারণ মানুষ পিপিই এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গাফেলতি ছিল স্পষ্ট। সরকার আরো ব্যাপক এবং পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসলে মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার এই সংকট সৃষ্টি হতো না। এখনো এক্ষেত্রে অবহেলা লক্ষণীয়। আসছে শীতে করোনা মোকাবিলায় কি ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে, সে রকম কোন পরিষ্কার নির্দেশনা এখনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাজ থেকে পাইনি।

ডা. কাফি খোরশেদের বক্তব্যে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে কর্মরত হাসপাতাল প্রসঙ্গে বলেন, শুরুর দিকে পিপিই সহ কিছু জিনিসের অপর্যাপ্ততা থাকলেও ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো অনেকটা কেটে গেছে। রোগীরা এখন অনেকটা আস্থা ফিরে পেয়েছেন।

দেশের স্বাস্থ্যখাতের উপর সাধারণ মানুষের অনাস্থা শুধু করোনাকালেই নয়, আগেও ছিল বলে মনে করেন ডাঃ হাসনাত। তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাতারাতি তার সমাধানও সম্ভব নয়। মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং নিজের দ্বারা যেনো অন্য কেউ সংক্রান্ত না হয় সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। শুরুর দিকে মানুষ মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেও এখন অনেকটা উদাসীন।

বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মৃত্যুহার অনেক কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক্ষত্রে অবশ্যই চিকিৎসক এবং নার্সদের কৃতিত্ব স্বীকার করতে হবে।

করোনা আক্রান্ত মানুষদের সাহায্য করতে গিয়ে শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে খোরশেদ জানান, ওইসময় করোনা আক্রান্ত মানুষদের প্রতি প্রতিবেশী-সমাজ এমন আচরণ করতো যেনো তারা মানুষ নন, বড় কোন অপরাধী। তখন ভয় ছিল মানুষের মধ্যে। এখন সেই ভয় কেটে গেছে। কিন্তু এখন মানুষ করোনা আক্রান্ত হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না। যার ফল হতে পারে ভয়াবহ।

জুলাই পর্যন্ত বহু হাসপাতাল এবং চেম্বার বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ অন্যান্য চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল স্বীকার করে ডা. কাফি বলেন, এখন ধীরে ধীরে সেগুলো খুলে যাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

বেসরকারী হাসপাতালে টেস্টের মূল্য অত্যধিক এবং বুথের সংখ্যা অপর্যাপ্ত যে কারণে উপসর্গ দেখা গেলেও অনেকেই টেস্ট করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন খোরশেদের এমন বক্তব্যের সাথে একমত প্রকাশ করে ডাঃ হাসনাত বলেন, বেসরকারি খাতে ভর্তুকি দিয়ে হলেও টেস্টের মূল্য কমাতে হবে। মানুষকেও সচেতন হতে হবে যেনো নিজের দ্বারা অন্য কেউ সংক্রমিত না হন। কর্তৃপক্ষকে নজরদারি করতে হবে যেন অন্য কারণে (যেমনঃ কিডনি ডায়ালাইসিস) অসুস্থ রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে অহেতুক বারবার করোনার টেস্ট করতে বাধ্য না হন।

এন্টিজেন টেস্টের ফলে নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেয়া সহজ হবে বলে মনে করেন ডা. কাফি। এছাড়া এই টেস্টে কালক্ষেপণ কম হবে বলে সংক্রমণের মাত্রাও কমে যাবে বলে তার মত।

মানুষকে মাইকিং করে এবং ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেন চলতে আহবান করছেন জানিয়ে খোরশেদ বলেন, মানুষকে মনে রাখতে হবে করোনা চলে যায়নি, তাই মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। করোনা নিয়েই যেহেতু চলতে হবে সুতরাং তার জন্য জীবিকাও থামিয়ে রাখা যাবে না, প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে।

বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে না পারায় এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি রোগী প্রাইভেট চেম্বারে আসছেন উল্লেখ করে ডাঃ হাসনাত বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আগের মতো চিকিৎসা দিতে সমস্যা হলেও আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সে সমস্যা কাটাতে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা বা অবহেলার কারণে কোন রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনরা যেনো চিকিৎসককে তার জন্য দায়ী না করেন, সহনশীল হন তার জন্য জনপ্রতিনিধিরা মানুষকে সচেতন করতে পারেন বলে মনে করেন খোরশেদ। বেসরকারী অনেক হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসকদের মানের ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। করোনাকালে অনেকে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা না নেয়াতে দেশে অনেক অর্থ জমা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বিদেশে চিকিৎসা না নেয়ায় তাদের কি লাভ বা ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনার অনুরোধ জানান।

এ প্রসঙ্গে ডা. কাফি বলেন, আমাদের দেশে অনেক ভালো চিকিৎসক রয়েছেন, লেখাপড়ার মানও ভালো৷ কিন্তু তাদের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গায় একটা সংকট রয়েছে। এদের মধ্যে হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার মান, চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কে ঘাটতি এমন অনেক কারণ রয়েছে। রোগী যেহেতু সেরা সেবাটাই চাইবেন, সেহেতু এক্ষেত্রে চিকিৎসককেই ভূমিকা পালন করতে হবে।

ডা. হাসনাত ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেসের ২০১৯ সালের একটি রিপোর্ট থেকে বলেন, বাংলাদেশীরা বিদেশে চিকিৎসা বাবদ ৩৫,০০০ কোটি টাকা বা ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেন যা দেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রতি বছরের বাজেটের চেয়েও বেশি। এ বছর এ পরিমাণ অর্থ বেঁচে গেছে, দেশের অর্থনীতির চাকা যে সচল রয়েছে সেক্ষেত্রে এর অবদান রয়েছে। এতো সংখ্যক লোক এ বছর বিদেশে চিকিৎসা নিতে না গেলেও দেশে মৃত্যুহার বেড়ে যায়নি। যা প্রমাণ করে দেশের চিকিৎসা সেবার মান খারাপ নয়। কিন্তু ভ্রান্ত ধারণা, মিথ্যা প্রচারণার কারণে মানুষ আস্থা হারায়। আর স্বাস্থ্যখাতে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে চিকিৎসরা নেই। এক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী ও জনবান্ধব না করলে এবং মিথ্যা প্রচারণা বন্ধ না হলে বিদেশ যাবার প্রবণতা থাকবেই। দেশের চিকিৎসকদের সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার খবর বেশি প্রচার পায়৷

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনাকালে অসহায় মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া টিম খোরশেদ এবং সীমিত সম্পদ নিয়েও কাজ করে যাওয়া দেশের চিকিৎসক এবং নার্সদের সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

1