টিকার লাইনে যে কারণে পিছিয়ে পড়াদের সংখ্যা কম

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টি ফোর ডটকম:  মো. সেলিম মিয়া। বয়স ৫০ বছরের বেশি। পেশায় একজন রিকশাচালক। ৫ সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকেন রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের ঝাউচর এলাকায়। করোনার টিকা নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের টিকা দেবে কে? বিনা পয়সায় দেবে? টিকা নিতে গেলে রিকশা বন্ধ করে যেতে হবে। রিকশা বন্ধ করলে খামু কী। ফেরি করে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করেন বিল্লাল হোসেন। বয়স ৪৫ বছর।
করোনার টিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, শুনেছি টিকা আইছে। নিবন্ধন করতে পারি না। কীভাবে টিকা নিমু। টাকা লাগবে? শুধু সেলিম বা বিল্লালই নন এমন পিছিয়ে থাকা অনেক মানুষ এখনো করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী হতে পারছেন না। তাদের কাছে পৌঁছেনি সঠিক তথ্য। তাই দ্বিধা-সংকোচের আবর্তে এসব মানুষ টিকা কার্যক্রমের বাইরে।

রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, টিকা নিতে আসা মানুষের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তরা। এদের মধ্যে আবার চাকরিজীবীদের সংখ্যাই বেশি।

লেখাপড়া না জানা, সুবিধাবঞ্চিত অথবা বস্তি এলাকার মানুষ একেবারেই নেই: হাজারীবাগ পার্কের পাশে নগর মাতৃসদন কেন্দ্রটি টিকা কেন্দ্র। এখানে কথা হয় স্বাস্থ্যকর্মী মেহের আফরোজ মিলির সঙ্গে। তিনি জানান, শিক্ষিত ও চাকরিজীবীরাই বেশি টিকা নিতে আসছেন। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ আসছেন খুবই কম। গত ১০ দিনে এরকম লোক খুব কমই চোখে পড়েছে। তিনি জানান, বিদেশ যাবেন এমন লোকও বেশ এগিয়ে আছেন টিকা নিতে। কেন্দ্রটিতে প্রতিদিন গড়ে দেড়শ’ থেকে ২০০ জন টিকা নিচ্ছেন। গতকাল এই কেন্দ্রে কথা হয় টিকাগ্রহণকারী নাজমা আলম নামের এক গৃহিণীর সঙ্গে। ৪৪ বছর বয়স তার। থাকেন মোহাম্মদপুর এলাকায়। তিনি জানান, স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য তিনি টিকা নিচ্ছেন। তার পরিবার সচেতন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সম্পর্কে তাদের বেশ জ্ঞান আছে। তাই নিবন্ধন করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড-১৯ টিকা দান কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই দুপুর পর্যন্ত ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে টিকা নিচ্ছে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। প্রায় প্রতিটি বুথে রয়েছে ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের চাপ। ভিআইপিদের জন্য করা হয়েছে আলাদা বুথ। ভ্যাকসিন সেন্টারের প্রবেশ মুখেই দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা মোবাইলে এসএমএস চেক করে আগতদের ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছেন। অনেকেই এসএমএস ছাড়া কেন্দ্রে ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য আসলেও ফিরে যেতে হয়েছে। কয়েকজন আনসার সদস্য জানান, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের লোকজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকাদান সেন্টারে টিকা নিতে আসেন। এখানে সুযোগ-সুবিধা ভালো থাকায় সবাই অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করার সময় এই কেন্দ্রটি বাছাই করেন। তবে ভিআইপি ও ভিভিআইপিদের চাপ অনেক বেশি। সাধারণ মানুষকে তেমন একটা আসতে দেখা যায় না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সাধারণ মানুষকে টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় আনতে এখন পর্যন্ত সফলতা দেখাতে পারেনি। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী তাদের সবাইকে দেশের জাতীয় এ কর্মসূচিতে যদি অন্তর্ভুক্ত না করা যায় তাহলে টিকাদান কর্মসূচি সফল হবে না। মানুষ সেবা নিতে আসবে এই আশায় থাকা যাবে না, মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে হবে-নয়তো সবাইকে টিকার আওতায় আনা যাবে না। তারা বলছেন, টিকা নিতে হলে যে রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি করা হয়েছে সেটা জটিল। অনেক শিক্ষিত মানুষই রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে আটকে যাচ্ছেন, সেখানে নিম্নবিত্ত অনেকের হাতেই স্মার্টফোন নেই, থাকলেও রেজিস্ট্রেশন তারা করতে পারেন না।
সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী টিকা নিতে আসছেন না এবং তাদেরকে আনতে কী উদ্যোগ নিতে হবে- জানতে চাইলে জাতীয় পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরো সহজ করতে হবে। একজন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, কুলি তারা এই প্রক্রিয়ায় টিকা নিতে পারবে না। এদের জন্য সহজে ভ্যাকসিন দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জন্য ভ্যাকসিন দেয়ার ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে সরকারকে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)- সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং সংস্থাটির উপদেষ্টা ডা. মুস্তাক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, সাধারণ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। নমুনা সংগ্রহের মতো বুথ তৈরি করতে হবে। খেটে খাওয়া মানুষদেরকে তাদের কাছাকাছি হাসপাতালে ভ্যাকসিন দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই বিষয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের এ বিষয়ে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। যেসব এনজিওদের এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা আছে তাদের কাজে লাগাতে হবে। তৃণমূলে কমিউনিটি ক্লিনিককে কাজে লাগাতে হবে। আরো বেশি বেশি মাইকিং, ব্যানার, শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পর মসজিদে বলতে হবে। প্রচার-প্রচারণায় জোর দিতে হবে।

1