বাংলাদেশকে আর কেউ পেছনে টানতে পারবে না

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টি ফোর ডটকমঃ   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। একটি শ্রেণি এই উন্নয়ন দেখে না। তারা নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। যোগাযোগের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে আর কেউ পেছনে টানতে পারবে না। এর মাঝেই কিছু কিছু ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটছে, ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হচ্ছে। যাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। সেই সঙ্গে প্রচারও চালানো হয়।

আমরা যতই উন্নতি করি, ভালো কাজ করি। একটা শ্রেণিই আছে বাংলাদেশের বদনাম করতেই তারা ব্যস্ত থাকে। এদের সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন থাকতে হবে।
গতকাল বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে পায়রা নদীর উপর ‘পায়রা সেতু’র উদ্বোধনকালে গণভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় একইসঙ্গে ২০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত আরও ৫৬ কিলোমিটার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীতকরণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারীরা এদেশের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক তারা চায় না। দেশে একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাদের একটু কদর বাড়ে। সেজন্য উন্নয়নটা তারা দেখে না বরং ধ্বংসই সবসময় করতে চায়- এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। এ ব্যাপারে দেশবাসীকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। পায়রা সেতুর উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বরিশাল এবং পটুয়াখালীর সংযোগ সৃষ্টিকারী এই পায়রা সেতু। নদীর নামে একটা সেতু হলে নদীটারও একটা পরিচয় থাকে। যে কারণে এই নামটাই আমি পছন্দ করেছি। আর পায়রা শান্তির প্রতীক। কাজেই, এই সেতু হওয়ার পর এই অঞ্চলের মানুষের আর্থিক উন্নতি হবে। মানুষের মনে একটা শান্তি আসবে। মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ফলে তারা ভালোভাবে বাঁচতে পারবে, সেই সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, তার সরকারের ১ম মেয়াদে সর্বপ্রথম লাউকাঠি নদীতে পটুয়াখালী সেতু নির্মাণ করা হয়। পর্যায়ক্রমে কীর্তনখোলা নদীর উপর শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু (দপদপিয়া সেতু), খেপুপাড়ায় আন্ধারমানিক নদীর উপর শহীদ শেখ কামাল সেতু, হাজীপুরে সোনাতলা নদীর উপর শহীদ শেখ জামাল সেতু এবং মহিপুরে খাপড়াভাঙ্গা নদীর উপর শহীদ শেখ রাসেল সেতু নির্মিত হয়েছে। আজ পায়রা নদীর ওপর দৃষ্টিনন্দন পায়রা সেতু নির্মিত হলো। এরফলে এখানে পর্যটনের সুযোগ যেভাবে বৃদ্ধি পাবে, তেমনি সরকার পায়রায় যে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করছে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও সৃষ্টি হবে। আর সমগ্র বাংলাদেশেও একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাল, বিল, নদী-নালার এই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে। কাজেই, এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নতি যত দ্রুত আমরা করতে পারি ততই এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হবে। ফলে, এর একটা বিরাট প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়বে এবং দেশটাকে আমরা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো। দেশের যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে সেটা আওয়ামী লীগ সরকারই করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সারা বাংলাদেশে একটি যোগাযোগের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেই আওয়ামী লীগ সরকার ‘ধরলা সেতু’ নির্মাণ করে। যমুনা নদীর উপর রেল যোগাযোগসহ বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই করা। বরিশাল বিভাগে কেবল সুন্দর রাস্তাই আমরা করিনি এখানে আমাদের ক্যান্টনমেন্ট নির্মাণ হয়েছে (লেবুখালি), একটি নৌ-ঘাঁটি ও বিমান ঘাঁটি হচ্ছে। সেই সঙ্গে কোস্টগার্ডের প্রশিক্ষণের জন্য কোস্টগার্ড ঘাঁটিও এখানেই করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, গলাচিপায় বীজ গবেষণা কেন্দ্র করা হয়েছে এবং পায়রা বন্দর করা হয়েছে এভাবেই পুরো বরিশাল নিয়েই একটি বড় কর্মযজ্ঞ চলছে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য প্রবাসে জনমত গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধে লন্ডন প্রবাসী সিলেটের জনগণের অবদানের কথা স্মরণ করে সরকার প্রধান বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা সবসময় দেশের উন্নয়নে সরকারের পাশে রয়েছেন। যে কারণে আমাদের হৃদয়ে তারা একটি বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছেন। তাই, সিলেটের রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সরকার একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ক্যান্টনমেন্ট করেছে। সিলেটের সার্বিক উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ঢাকা-সিলেট সড়কটিকে একটি দৃষ্টিনন্দন আধুনিক সড়ক হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। এই সড়ক দিয়ে যখন লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে এসে যাতায়াত করবেন তখন লন্ডনে আছেন না কোথায় আছেন তা চিন্তা করতে হবে।
সেতু উদ্বোধনকালে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম প্রকল্পগুলোর ওপর প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে প্রকল্পগুলোর ওপর পৃথক ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। প্রকল্পের উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালী এবং সিলেট প্রান্তে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত প্রশাসন, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, কেন্দ্র্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ এমপি গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা-সিলেট ৬ লেন সড়কের কাজ শুরু
ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে জানান, সিলেট অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণে ৬ লেন সড়কের কাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী এই সড়কের কাজের উদ্বোধন করেন। প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এটি সরকারের বড় প্রকল্পের অন্যতম একটি। এটি ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তবে এই মহাসড়কের কাজ শুরু হচ্ছে ঢাকা অংশ অর্থাৎ কাঁচপুর ব্রিজের কাছ থেকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন শুক্রবার সিলেট সফরকালে কাজ শুরুর কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন; ‘আমরা চেয়েছিলাম, সিলেট থেকে কাজ শুরু করা হোক। কিন্তু প্রস্তুত না থাকায় সেটি করা হয়নি। এক্ষেত্রে আমাদের প্রশাসনিক কাজে ধীরগতি ছিল।’ পররাস্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘কয়েক বছর আগে যখন এই সড়কের প্রস্তাবনা তৈরি হয় তখন কাজের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এখন সেখানে আরও ৭ হাজার কোটি টাকা বেশি লাগছে। এরপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তরিক থাকার কারণে ৬ লেন সড়কের কাজ শুরু হচ্ছে। সেটি সিলেটের তামাবিল পর্যন্ত যাবে।’ গতকাল ভার্চ্যুয়ালি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সারা দেশে একটা সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করেছি। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছি। ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে কিন্তু ধরলা সেতুও আমাদের সময় করা। যমুনা নদীর উপর রেলসহ বঙ্গবন্ধু সেতু এই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা। কাজেই এদেশে যতটুকু উন্নয়ন সেটা আমরাই করেছি। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশনসহ যত উন্নয়ন হয়েছে সবই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।’ গণভবনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিকে, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সিলেট থেকে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হন জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ সময় জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন- সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিলুর রহমান, জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান, মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন প্রমুখ। গত কয়েক বছর ধরে সিলেটের মানুষের অন্যতম দাবি ছিল তিনটি। এই দাবিগুলোর মধ্যে সবক’টি হচ্ছে যোগাযোগ সম্পর্কিত। এর মধ্যে একটি ছিল ঢাকা- সিলেট মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করা। এটি ছিল সিলেট-১ আসনের এমপি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। গত সংসদ নির্বাচনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বানে নারায়ণগঞ্জ থেকে সিলেট অংশের মন্ত্রী ও এমপিরা ঢাকায় বৈঠক করে ৬ লেন সড়কের দাবি জোরালো ভাবে তুলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই দাবির প্রতি ইতিবাচক ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে চারলেনের এই সড়ককে ৬ লেনে রূপান্তর করা হয়। এজন্য শনিবার সিলেট সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭ সালে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না হারবারের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু চায়না হারবার যে ব্যয় প্রস্তাব করে, তা ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রাক্কলনের চেয়ে ৪২ শতাংশ বেশি। ফলে চায়না হারবারের সঙ্গে কাজের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়নি। এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। ঢাকার কাঁচপুর থেকে সিলেটের পীর হাবিবুর রহমান চত্বর পর্যন্ত ২১০ কিলোমিটার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা হবে। এতে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রকল্পে সিংহভাগ টাকা দিচ্ছে এডিবি। এরই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার এডিবি ১৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার কাঁচপুর থেকে সিলেটের পীর হাবিবুর রহমান চত্বর পর্যন্ত প্রস্তাবিত সড়কটির দৈর্ঘ্য হবে ২০৯ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করবে সরকারের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।

1