খালেদা জিয়াকে নিয়ে উদ্বেগ, সক্রিয় বিএনপি

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টি ফোর ডটকমঃ   রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে উদ্বিগ্ন দলটির নেতাকর্মীরা। হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে- দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এ ঘোষণার পরই নড়েচড়ে বসেন সবাই। তাকে বিদেশে চিকিৎসা সেবা দেয়ার দাবিটিও জোরালো হয়। বিদায়ী বছরের শেষদিকে এসে এ দাবিতে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠে বিএনপি। করোনাসহ নানা কারণে বছরের শুরুতে তেমন সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারেনি দলটি। সংক্রমণ কমে আসার পর বছরের শেষ কয়েক মাস মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে বিএনপি। বড় কর্মসূচির বাইরেও মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, দোয়া মাহফিল, জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা, স্থায়ী কমিটির সাপ্তাহিক বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের সক্রিয় রেখেছে দলটি। তবে কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে দলটি।রণক্ষেত্র হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাব, নয়াপল্টন, শেষদিকে এসে হবিগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ। আহত হয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মী।

অসুস্থ খালেদা জিয়া: শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পাওয়ার পর দীর্ঘদিন বাসায় অবস্থান করছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ সময় গত ১১ই এপ্রিল করোনা আক্রান্ত হন। ২৭শে এপ্রিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। আক্রান্তের ২৭ দিন পর ৯ই মে করোনা মুক্ত হন। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ১৯শে জুন বাসায় ফেরেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। শারীরিক অবস্থার ফের অবনতি ঘটলে ১২ই অক্টোবর হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে এদিন রাতেই সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয় খালেদা জিয়াকে। টানা ২৬ দিন ওই হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ৭ই নভেম্বর বাসায় ফেরেন তিনি। এর ৬ দিন পর ১৩ই নভেম্বর আবারও এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। বর্তমানে লিভার সিরোসিসসহ নানা জটিল রোগে খালেদা জিয়া আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড। তারা বলছেন, ক্রমশই তার শারীরিক অবস্থা জটিল হচ্ছে। এ রোগের চিকিৎসার জন্য এ মুহূর্তে যে প্রযুক্তি দরকার তা দেশে নেই। তাই যত দ্রুত সম্ভব উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দেন তারা। খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেছেন তার পরিবার ও দলের নেতারা। এ নিয়ে সংসদও উত্তপ্ত হয়। সরকার আইনের ব্যাখ্যা দিলেও বিএনপি আইনের পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে সরকারকে মানবিক হওয়ার আহ্বান জানায়।

মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার দাবিতে বিএনপি’র কর্মসূচি: খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে একের পর এক কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। ২০শে নভেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সমানে গণ-অনশন করে দলটি। গণ-অনশন থেকে ২২শে নভেম্বর একই দাবিতে সারা দেশে মহানগর ও জেলায় সমাবেশের ঘোষণা দেন বিএনপি মহাসচিব। ২২শে নভেম্বর ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ হয়। ২৪শে নভেম্বর সারা দেশে জেলা প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি পেশ করে বিএনপি। একইদিনে ৮ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২৫শে নভেম্বর থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে ২২শে ডিসেম্বর থেকে ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩২ জেলায় সমাবেশ করেছে বিএনপি। এসব সমাবেশ বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

চার বছর পর নির্বাহী কমিটির সঙ্গে বিএনপি’র বৈঠক: প্রায় চার বছর পর গত সেপ্টেম্বরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি’র হাইকমান্ড। ১৪, ১৫, ১৬ই সেপ্টেম্বর বিএনপি’র কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সম্পাদকমণ্ডলী এবং অঙ্গ সংগঠনের মোট ২৮৬ জন নেতা অংশ নেন। ২১, ২২, ২৩শে সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠান হয়। জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা যারা বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নয় তারাও এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি’র এ বৈঠক দেশের রাজনীতিতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

দল পুনর্গঠনে সক্রিয়: গত কয়েক বছর ধরে দল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। তবে এ বছরের সক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও দল পুনর্গঠন নিয়ে এখনো হতাশা রয়ে গেছে বিএনপিতে। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে দলের ৮১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে এ পর্যন্ত ৫৫টিতে কমিটি করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরে ৩০ জেলায় নতুন কমিটি হয়। এছাড়া জাতীয়তাবাদী কৃষক দল ও জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) নতুন কমিটি ঘোষণা হয় এ বছর। সারা দেশে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন প্রায় ৮০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। মহিলা দলের জেলা কমিটি গঠনও অনেক দূর এগিয়েছে। যদিও ৩০শে ডিসেম্বরের মধ্যে বিএনপিসহ সব অঙ্গসংগঠনকে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ২০২১ সালে বিএনপিতে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল মহানগর কমিটি পুনর্গঠন। ঢাকায় আমানউল্লাহকে মহানগর উত্তর এবং আবদুস সালামকে দক্ষিণের আহ্বায়ক করে কমিটি দেয়া হয়। সব মহানগরেই নেতৃত্ব থেকে পুরনোরা বাদ পড়েন। এর মধ্যে বরিশালে মজিবর রহমান সরোয়ার, খুলনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জু, রাজশাহীতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বাদ পড়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে দলে।বিএনপি’র দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলে নানা প্রতিকূলতার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

কারণ দর্শানোর নোটিশ ও বহিষ্কার: দলের মধ্যে শৃঙ্খলা আনতে চলতি বছর বেশ তৎপর ছিল বিএনপি। এর মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে তার একটি বক্তব্যের বিষয়ে ব্যাখ্য চাওয়া, ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শফি আহমেদ চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কার, নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে, কুমিল্লার মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকে নির্বাহী কমিটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। শফি আহমেদ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সিলেট-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। মনিরুল হক সাক্কু দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, সর্বশেষ চিঠি পেয়েও দলের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থিত হননি। আর নজরুল ইসলামকে অব্যাহতি দেয়া হয় সংবাদ সম্মেলন করে নবগঠিত খুলনা মহানগর কমিটির ব্যাপারে বিরূপ মন্তব্যের জন্য।

রাষ্ট্রপতির সংলাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত: নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য প্রেসিডেন্টের চলমান সংলাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। সোমবার দলের স্থায়ী কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয় বলে জানিয়েছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে নির্বাচনকালীন সময়ে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ব্যতিরেকে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কোনো কমিশনই করতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট নিজেই বলেছেন, তার কোনো ক্ষমতা নেই পরিবর্তন করার। সেই কারণে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ কোনো ইতিবাচক ফলাফল আনতে পারবে না। বিএনপি অর্থহীন কোনো সংলাপে অংশগ্রহণ করবে না।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশে যে অগণতান্ত্রিক একটা স্বৈরাচারী সরকার আছে, যাদের দ্বারা নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, ২০২২ সালে তাদের এই অপশাসনের অবসান হবে। দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে আন্দোলন তা সফল হবে। মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে। দেশে প্রকৃত উন্নয়ন হবে। দেশের মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পাবে।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আজকে বাংলাদেশে যে একটা ফ্যাসিস্ট শাসন চলছে তার থেকে মানুষ মুক্তি চায়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফেরত পেতে চায়। আর সেজন্যই আমরা আন্দোলনে আছি এবং থাকবো। আমরা আশা করছি ২০২২ সালের মধ্যে মানুষের যে নৈতিক অধিকার সে অধিকারগুলো আমরা ফেরত আনতে পারবো। সঙ্গে সঙ্গে যিনি এদেশের গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করেছেন এদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন সেই বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে পারবো।

1