ক্ষমতার অপব্যবহার: গ্রেফতার, রিমান্ড ও নির্যাতন- এ্যাডঃ তৈমূর আলম খন্দকার

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ  টুয়েন্টিফোর ডটকম:  গ্রেফতার ও রিমান্ড নিয়ে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পৃথিবীব্যপী পুলিশ সাধারণ নাগরিকের উপর নির্যাতন করে। এ নির্যাতন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর সচেতন মানুষ স্বোচ্চার হয়। ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘের উদ্দেগ্যে ১৯৮৪ সালের ১০ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পুলিশ নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লজ্জাকর ব্যবহার অথবা দন্ডবিরোধী একটি সনদ নিউইয়র্কে স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৯৮ ইং সালের ৫ই অক্টোবর বাংলাদেশ উক্ত সনদে স্বাক্ষর করে সম্মতি জ্ঞাপন করে। জাতিসংঘ সনদের ২(১) ও ৪ অনুচ্ছেদে নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্চনার ব্যবহার আইনগত অপরাধ হিসাবে ঘোষনা করা হয়েছে। জাতিসংঘ প্রদত্ব উপরিক্ত সনদের অঙ্গীকারসমূহ কার্যকারিতা প্রদানে আইনী বিধান প্রনয়ণ সমীচীন ও প্রয়োজন হওয়ায় পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্যাতন বন্ধ করার জন্য ২৭ই অক্টোবর’ ২০১৩ তারিখে “নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারন) আইন’ ২০১৩” পাস ও কার্যকর করা হয়। কিন্তু এতদস্বত্বেও সাধারণ নাগরিকের উপর পুলিশ নির্যাতন কমে নাই এবং ক্ষমতায় অপব্যবহারের প্রশ্নে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাষ্ট্র যেন একটি ওপেন চেক প্রদান করেছে।

ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারা মোতাবেক যে কোন সন্দেহভাজন ও তথ্যের ভিত্তিতে যে কোন নাগরিককে গ্রেফতার করার ক্ষমতা পুলিশ’কে দেয়া হয়েছে বটে, কিন্তু সে ক্ষমতা প্রয়োগের প্রশ্নে আইনে বলা হয়েছে যে, সন্দেহ হতে হবে জবধংড়হধনষব ঝঁংঢ়রংরড়হ এবং তথ্য হতে হবে নির্ভরযোগ্য (ঈৎবফরধনষব রহভড়ৎসধঃরড়হ)। ফৌজদারী কার্যবিধির ৬১ ধারা মোতাবেক ২৪ ঘন্টার মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু উক্ত সময়ের মধ্যে যদি তদন্ত সমাপ্ত করা না যায় তবে কার্যবিধির ১৬৭(২) ধারা মোতাবেক পুলিশের প্রার্থনা মোতাবেক যে কোন মামলায় অনুর্ধ ১৫ দিন পর্যন্ত রিমান্ড মঞ্জুর করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে যাতে নির্যাতন নিপীড়ন করা না হয় এজন্য বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের এ্যাপিলেট ডিভিশন ও হাই কোর্ট ডিভিশন কতিপয় দিক নির্দেশনা দেয়া স্বত্বেও তা কার্যকর হচ্ছে না। বিচারপ্রতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এবং বিচারপতি শরীফউদ্দিন চাকলাদার সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট ডিশিভন ০৪/৮/২০০৩ ইং সাইফুজ্জামন আনীত মামলায় ১১টি দিক নির্দেশনা জারী করে। উক্ত দিক নির্দেশনায় বল হয়েছে যেঃ-

(১) কাহাকেও গ্রেফতারের সময় পুলিশ একটি স্বারক তৈয়ার করে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর গ্রহণ করবে।

(২) গ্রেফতারের অনুর্ধ ০৬ (ছয়) ঘন্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট আতœীয় ও বন্ধুদেরকে গ্রেফতারের বিষয়টি জানাইতে হবে।

(৩) গ্রেফতারের কারণ, বাদী বা তথ্য দাতার নামঠিকানাসহ কোন পুলিশ অফিসারের তত্বাবধানে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি অবস্থান করছে তার নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করতে হবে।

(৪) রিমান্ড পিডিয়ড শেষ হওয়ার পর গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ম্যাজিস্টেটের নিকট হাজির কারতে হবে।

(৫) নির্যাতন করে কাহারো নিকট থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা যাবে না।

(৬) গ্রেফতারকৃত কোন ব্যক্তিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩ ধারা মোতাবেক ডিটেনশন প্রদান করার জন্য পুলিশ আবেদন করে তবে ম্যজিস্ট্রেট উক্ত আবেদন গ্রহণ করবেন না। এ ধরনের ১১টি দিক নির্দেশনা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী’কে হাই কোর্ট প্রদান করে (সূত্র: ৫৬ ডি.এল.আর হাই কোর্ট/৩২৪)।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইউ এন্ড সার্ভিস ট্রাষ্ট (ব্লাষ্ট) এর আবেদনক্রমে (রীট পিটিশন নং-৩৮০৬/১৯৯৮) ০৭/৪/২০০৩ ইং তারিখে বিচারপতি হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত ব্যাঞ্চ ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারা কোন ক্ষেত্রে এবং কোন পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা যাবে এ মর্মে ১৫টি দিক নির্দেশনা প্রদান করে ০৬ মাসের মধ্যে তা কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন (সূত্র: ৫৫ ডিএলআর-৩৬৩/২০০৩)। উক্ত নির্দেশাবলীও এখনো আইনে পরিনত হয় নাই এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কার্যকর করছে না।

২৪/০৫/২০১৬ ইং তারিখে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিচারপতি মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাছান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মীর্জা হোসাইন হায়দার সমন্বয়ে গঠিত এ্যাপিলেট ডিভিশন ব্যাঞ্চ গ্রেফতার ও রিমান্ডে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন ও দুরব্যবহার প্রতিরোধকল্পে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ০৭টি দিক নির্দেশানাসহ ১০টি গাইড লাইন প্রদান করা ছাড়া বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি দিক নির্দেশনা প্রদান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতারকৃতদের প্রতি কি ধরনের আচরন হওয়া আইনত বাঞ্চনীয় তা নির্ধারন করেছেন (সূত্রঃ ৬৯ ডি.এল.আর, এডি-৬৩)। উল্লেখ্য সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে, “আপীল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাই কোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রীম কোর্টের যে কোন বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অর্ধস্তন সকল আদালতের অবশ্য পালনীয় হইবে।”

সাধারন মানুষের উপর আইন প্রয়োগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বেচ্ছাচারিতারোধ করার জন্য এ্যাপিলেট ডিভিশন ও হাই কোর্ট যে দিক নির্দেশনা প্রদান করেছে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক তা পালন করতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও নি¤œআদালত বাধ্য। তা স্বত্বেও প্রতিনিয়তই জনগণ হয়রানীর শিকার সহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হয় নাই। তদুপরি সংবিধানের ৩৩ ও ৩৫ অনুচেছদে উল্লেখ রয়েছেে য :-

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৩৩

“(১) গ্রফতারকৃত কোন ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেপ্তারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাঁহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তাঁহার দ্বারা আতœপক্ষ সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।

(২) গ্রেপ্তারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেপ্তারের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে (গ্রেপ্তারের স্থান হইতে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাঁহাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।”

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৩৫

“(১) অপরাধের দায়যুক্ত কার্যসংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাঁহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দন্ড দেওয়া যাইবে না।

(২) এক অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারীতে সোপর্দ ও দন্ডিত করা যাইবে না।

(৩) ফৌজদারী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকারী হইবেন।

(৪) কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাইবে না।

(৫) কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দ- দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।

(৬) প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট কোন দ- বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোন বিধানের প্রয়োগকে এই অনুচ্ছেদের (৩) বা (৫) দফার কোন কিছুই প্রভাবিত করিবে না।”

সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের “প্রস্তাবনার” ৪র্থ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষনা করিতেছি যে, আমরা যাহাতে স্বাধীন সত্তার সম্পৃক্তি লাভ করিতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাঙ্খার সহিত সংগতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগীতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারি, সেই জন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি স্বরূপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুন্ন রাখা এবং ইহার রক্ষন, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য।”

বাংলাদেশে বর্তমানে আইনের শাসন আছে, কিন্তু সুশাসন নাই। আইনের শাসন এক পেশে চলছে। একই আইন ক্ষমতাসীনদের প্রতি কার্যকর হয় একভাবে এবং সাধারণ নাগরিক যাদের “মামার” জোর বা খুটির জোর নাই বা যারা উপর তালার কারো রেফারেন্স ব্যবহার করতে পারে না তাদের জন্য আইন প্রয়োগ হয় ভিন্নভাবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসাবে সকলের দায়িত্ব সংবিধানকে সম্মুনত রাখা। সংবিধান যদি কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে তবে রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতার চেতনা হবে মূল্যহীন। ‌

1