অবিশ্বাস্য মোস্তাফিজ, মিরপুরে ইতিহাস

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:  অবিশ্বাস্য বোলিং নৈপুণ্য দেখালেন মোস্তাফিজুর রহমান। আর রুদ্ধশাস জয় দিয়ে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ। গতকাল সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে অস্ট্রেলিয়াকে ১০ রানে হারায় টাইগাররা। আগে ব্যাটিং শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ১২৭/৯। জবাবে পুরো ২০ ওভার ব্যাটিং করে অজিরা ইনিংস শেষ করে ১১৭ রানে। তখনও ক্রিজে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার স্বীকৃত দুই ব্যাটসম্যান অ্যালেক্স ক্যারি ও ড্যান ক্রিস্টিয়ান। যে কোনো ফরম্যাটের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয়।

শেষ দিকে নিক্তির পাল্লার মতো দুলছিল ম্যাচের ভাগ্য। শেষ ওভারে প্রয়োজন ২২ রান, শেখ মেহেদী হাসানের ওভারের শুরুতেই শর্ট বল পেয়ে ছক্কা মেরে ম্যাচ জমিয়ে দেন অ্যালেক্স ক্যারি।

পরের বলে আসে ১ রান। তৃতীয় বলে রান নেই। পরেরটি নো বল করে বসেন মেহেদী। আবার জমে ওঠে নাটকীয়তা। তবে শেষ পর্যন্ত স্নায়ুর চাপ জয় করে ম্যাচ শেষ করেন মেহেদি। শেষ ওভার থেকে অস্ট্রেলিয়া নিতে পারে ১১ রান। বাংলাদেশ জয় পায় ১০ রানে। তবে ১৯তম ওভারে মাত্র ১ রান দিয়ে ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যান মোস্তাফিজুর রহমান। এদিন উইকেট না পেলেও নিজের চার ওভারের স্পেলে মাত্র ৯ রান দেন বাংলাদেশের ‘বোলিং বিস্ময়’। সেই সঙ্গে টানা তিন ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় দিয়ে রচিত হয় টাইগার ক্রিকেটে নয়া ইতিহাস।

এ নিয়ে সিরিজের টানা তিন ম্যাচেই ব্যাট হাতে ভুগতে দেখা গেলো অজিদের।  প্রথম ম্যাচে তারা পুরো ২০ ওভার খেলে সবকটি উইকেট হারিয়ে ১০৮ রান করেছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেট হারিয়ে ১২১ রান।

এদিন সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচে মরিয়া অজি ব্যাটসম্যানরা শুরুটা করলেন দারুণ সতর্কতার সঙ্গে। পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশ তুলেছিল ২৮ রান। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ওভারে ৮ রান তুললেও পাওয়ার প্লের ৬ ওভারে তোলে এক উইকেট হারিয়ে ২০ রান। টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে পাওয়ার প্লেতে অস্ট্রেলিয়ার এটি সবচেয়ে ছোট সংগ্রহ।

নাসুম আহমেদ দলকে উপহার দেন প্রথম উইকেট। ১ রানেই সাজঘরের  পথ ধরেন ক্যাঙ্গারু অধিনায়ক ম্যাথু ওয়েড। এছাড়াও সাকিব আল হাসানের পর মোস্তাফিজুর রহমান চেপে ধরেন সফরকারীদের। তবে দলের হাল ধরেন সিরিজে প্রথমবারের মতো সুযোগ পাওয়া বেন ম্যাকডারমট ও ইনফর্ম ব্যাটসম্যান মিচেল মার্শ। ধীরে ধীরে টাইগার বোলারদের ওপর ব্যাট হাতে প্রভাব বিস্তার করে জুটি এগিয়ে নিতে থাকেন এ দুজন। চাপে থাকা মাহমুদুল্লাহর তখন দরকার উইকেট। বল হাতে সেই সুযোগটি দলকে করেও দিয়েছিলেন মোস্তাফিজ। তার লেগ স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট চালিয়েছিলেন বেন ম্যাকডারমট, ডিপ স্কয়ার লেগে শরীফুলের কাছে গিয়েছিল ক্যাচ। তবে শরীফুল হাতে রাখতে পারেননি সেটি। ব্যক্তিগত ৩২ রানে জীবন পান ম্যাকডারমট। তবে পরে বেশিদূর যেতে পারেননি তিনি।

নিজের শেষ ওভার করতে এসে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্রেক থ্রু এনে দেন সাকিব আল হাসান। ফুল লেংথের বলে স্লগ করতে গিয়েছিলেন ম্যাকডারমট। তবে আন্ডার-এজড হয়ে বোল্ড হয়ে যান অজি ওপেনার।  ৪১ বলে ৩৫ রানের ইনিংসে ম্যাকডরম্যাট হাঁকান দুটি ছক্কা। দ্বিতীয় উইকেটে মার্শ-ম্যাকডারমট গড়েন ৭১ বলে ৬৩ রানের জুটি। আর এ জুটি ভাঙতে ‘ফুয়েল’ পান টাইগাররা।
কন্ডিশন সহজ নয়, সিরিজ ঝুলছে সুতোর ওপর। মিচেল মার্শ নেমেছিলেন দলীয় ৮ রানে প্রথম উইকেট যাওয়ার পর। ৪৫ বলে ফিফটিও হয়ে গেল তার। টাইগারদের জয়ের মাঝে সবচেয়ে বড় ব্যবধান তিনিই। শেষ ২১ বলে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ৩৬ রান। তবে সেই সময় চাপ কমাতে শট খেলতে হলো মিচেল মার্শকে, ক্রিজ ছেড়ে বেড়িয়ে এসে শরিফুলকে তুলে মেরেছিলেন। লং-অফ থেকে ছুটে এসে ভালো ক্যাচ নেন মোহাম্মদ নাঈম। ৫১ রানে ফিরলেন মার্শ। আর এখান থেকেই জমে ওঠে নাটকীয়তা।

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে বৃষ্টির শঙ্কা ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু প্রথম দুই ম্যাচে তা বাঁধা হতে পারেনি। তবে গতকাল তৃতীয় ম্যাচের আগে বৃষ্টির হানা, সন্ধ্যা ৬টায় ম্যাচ শুরুর কথা থাকলেও হলো না। শেষ পর্যন্ত মেঘ কেটে গেল, ৭টায় টসের পর খেলা শুরু হলো সোয়া ৭টায়। সোয়া এক ঘন্টা দেরিতে খেলা শুরু হলেও ওভার কাটা যায়নি কোনো। ইনিংস বিরতি কমিয়ে আনা হয় ১০ মিনিটে। টানা দুই ম্যাচ জিতলেও টসে হেরেছে বাংলাদেশ। গতকাল অবশ্য টসভাগ্য সহায় হলো টাইগার অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের। টসে জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে বল হাতে সিরিজ বাঁচাতে মরিয়া অজিরা টাইগারদের চেপে ধরলো শক্তভাবে। ধুকতে ধুকতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সংগ্রহ পৌঁছে ১২৭ রানে।  শেষ ওভারে ন্যাথান এলিস টানা তিন বলে উইকেট নিয়ে অভিষেক স্মরণীয় করে রাখলেন । স্বপ্নের অভিষেক বোধহয় একেই বলে! ৩ ওভারে ২৯ রান দিয়েছিলেন, ছিলেন উইকেটশূন্য। তবে ড্যান ক্রিস্টিয়ানের বদলে তাকেই শেষ ওভারে আনলেন ওয়েড।  ওভারের চতুর্থ বলে মাহমুদুল্লাহ হলেন বোল্ড। পরের দুই বলে ক্যাচ দেন মোস্তাফিজুর রহমান ও মেহেদী হাসান। ৩৪ রানে ৩ উইকেট নিয়ে বোলিং ফিগার শেষ করেন এলিস।  সেই সঙ্গে জায়গা করে নেন ইতিহাসের পাতায়।

আরো একবার ব্যর্থ বাংলাদেশের ওপেনিং জুটি। নাঈম শেখ ও সৌম্য সরকার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফিরে যান সাজঘরে। ৩ রানেই দুই উইকেট হারানো দলকে পথ দেখানোর দায়িত্ব নেন সাকিব আল হাসান ও মাহমুদুল্লাহ। যদিও এই জুটি বড় হয়নি। দলীয় ৪৭ রানে থামেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুক্রবার ১৫ বছর পূর্ণ করা সাকিব। এর আগে ১৭ বলে ৪টি চারে ২৬ রান করেন বাঁহাতি এই অলরাউন্ডার। এরপর অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহই ব্যাট হাতে যা লড়াই করেছেন। দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে ৫৩ বলে ৪টি চারে ৫২ রানের ইনিংস খেলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। টি-টোয়েন্টিতে এটা তার পঞ্চম হাফ সেঞ্চুরি। আর অধিনায়ক হিসেবে প্রথম। ২০ ওভারের ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে মন্থর ফিফটিও।  আফিফ হোসেন ধ্রুবও ভালো শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১১ বলে ১৯ রান করা বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান এক সরাসরি থ্রোতে রান আউট হয়ে যান। নুরুল হাসান সোহানও ভালো শুরু করেছিলেন। এক সরাসরি থ্রোতে রান আউটে কাটা পড়ে সোহানের উইকেটও। ৫ বলে ১১ রান করেন সোহান। আর দলের ঐতিহাসিক জয় শেষে লড়াকু অর্ধশতকের কারণে ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহর হাতে।

1