ডেঙ্গুর লাল বার্তা রোগী বাড়ছে জ্যামিতিক হারে

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:   করোনায় চলছে মৃত্যুর মিছিল। চারদিকে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট ও শোক। ঠিক সেই সময়ই নতুন হানা দিচ্ছে ডেঙ্গু। হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড়। প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন নতুন রোগী। সরকারি হিসাবে চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। এর মধ্য গত মাসে ২২৮৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি মাসের প্রথম ৫ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১ হাজার ২৪৩ জন।

আছে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরও। ২০২০ সালের জুন ও জুলাই মাসের তুলনায় চলতি বছরের গত দুই মাসে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে প্রায় ৬০ গুণ।

করোনা আতঙ্কে অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন বাসা-বাড়িতে। যে কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যাও থেকে যাচ্ছে আড়ালে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশুরা। এই অবস্থায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তারা বলছেন, জুলাইয়ের চেয়ে আগস্টে রোগী আরও বাড়বে। মাসের শেষদিকে রাজধানীসহ সারা দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। এজন্য সিটি করপোরেশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও নগরবাসী। গত মাসের শুরু থেকে উদ্বেগের কথা জানিয়ে আসছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও। চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা ও ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ অনেকটা একই রকম। ফলে একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে করোনা ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে বিগত বছরের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দেয়া অসাধ্য হয়ে যাবে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯ জন, মার্চে ১৩ জন, এপ্রিলে ৩ জন, মে মাসে ৪৩ জন, জুনে ২৭২ জন, জুলাই মাসে ২২৮৬ জন। আগস্টের প্রথম ৫ দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২৪৩ জন। গত কয়েক দিনের রিপোর্ট থেকে দেখা যায় চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৯০১ জন। এ পর্যন্ত রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু সন্দেহে ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রেরণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মানবজমিনকে বলেন, এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা বলে আসছি। সিটি করপোরেশন যেভাবে মশা নিধন করছে এভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। বর্তমানে যেসব অভিযান চলছে তা যথেষ্ট নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এডিসের ঘনত্ব বেড়েছে। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের তুলনায় বেড়েছে কয়েকগুণ। গত মাসে যে সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আগস্ট মাসের প্রথম চারদিনে তার অর্ধেকসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি মাসের শেষদিকে এডিসের প্রকোপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে রোগীও বাড়বে। সিটি করপোরেশন এডিসের আবাসস্থল চিহ্নিত করে তা দ্রুত নষ্ট করতে না পারলে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও বেশি অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমত এডিস মশার জন্মস্থল নষ্ট করতে হবে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশেনের পাশাপাশি নগরবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মশকনিধন কার্যক্রমে ভিন্নতা আনতে হবে। কিউলেক্স ও এডিস মশার ধরন আলাদা। স্বচ্ছ পানিতে, বাড়িঘরে, কনস্ট্রাকশন সাইটে এডিস মশা জন্মে। লার্ভিসাইটে ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশার প্রজনন বন্ধ করা কঠিন। তাই এডিসের লার্ভা নষ্টে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে সিটি করপোরেশনকে। এই মুহূর্তে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কমিটি করতে লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং স্প্রে করতে হবে। একযোগে এ অভিযান চালালে মশার বিস্তার কমবে।
সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান ও কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, চলতি বছরের গত ৩-৪ মাস ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। গত মাসের তুলনায় আগস্টে শুরু থেকে ভয়াবহ হচ্ছে। এমনভাবে চলতে থাকলে আগস্টের শেষদিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিবে। তবে করোনার মধ্যে ডেঙ্গু প্রকোপ থাকায় নগরবাসীর বিপদ আরও বাড়াবে। ঢাকার বাইরেও ভাইরাসজনিত এই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। লোকাল ট্রান্সমিশন সিস্টেমে ছড়িয়েছে এই ডেঙ্গুজ্বর। গত বছরের তুলনায় এ বছর এডিস মশা এবং ডেঙ্গু দুটোর উপস্থিতিই বেশি। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় এডিস এলবোপিক্টাস এবং ইজিপ্ট বেড়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা দিয়ে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪১টি হাসপাতালের কথা বলা হলেও এর মধ্যে অধিকাংশ হাসপাতাল করোনা রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। ফলে সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। অনেকেই হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে ডেঙ্গু রোগীর সঠিক সংখ্যাও পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে সেখানে বেশি বেশি ফগিং করতে হবে। লার্ভা পরে মারতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট প্রিন্সিপাল অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে। যা সিটি করপোরেশন এলাকায় এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। এখন শক্তিশালী ফগিং মেশিন দিয়ে প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে লার্ভিসাইডিং এবং এডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। শুধু অভিযান পরিচালনার মধ্য সীমাবদ্ধ থাকলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসবে না। কারণ বর্ষা মৌসুমের শুরুতে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা অন্য বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। পরিকল্পিত কার্যকর উদ্যোগই কেবল পারে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে। তবে এ ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতা ও সতর্কতার বিকল্প নেই। এছাড়া যারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবেন, তাদের মশারির মধ্যে আইসোলেশনে রাখতে হবে। এতে ডেঙ্গুর টান্সমিশন কম হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বুধবার স্বাস্থ্য বুলেটিনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারো আশঙ্কাজনক রূপ নিতে পারে, এমন উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্ষাকালে গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি এডিসবাহিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি, সেটি সময় সময় অত্যন্ত ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। ২০১৯ সালে আমরা দেখেছি, ডেঙ্গু মহামারি আমাদের কীভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। ২০২১ সালে এসে একই রকম পরিস্থিতির মুখে আমরা দাঁড়িয়েছি। আমরা মনে করি, দ্রুত ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবো।

এদিকে মশা মারতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন চলতি বছরের বাজেটে বরাদ্দ রেখেছে ৭২ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের চেয়ে ২ কোটি টাকা বেশি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মশকনিধনে গত বছরের তুলনায় এ বছর বাজেটে বরাদ্দ কমেছে। গত অর্থবছরে মশকনিধনে ব্যবহৃত কীটনাশক খাতে বরাদ্দ ছিল ৩০ কোটি টাকা। সে বছর খরচ হয়েছে ৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে নতুন অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে বছর বছর বরাদ্দ বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা মানবজমিনকে বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রতিটি এলাকায় এডিসের লার্ভা ধ্বংসে অভিযান চলছে। মশকনিধন কার্যক্রম আরও বেগবান করতে আমরা কাজ করছি। মেয়রসহ প্রতিটি এলাকায় আমরা উপস্থিত হয়ে অভিযান চালাচ্ছি। কাউন্সিলরদের সম্পৃক্ত করেছি। যেসব স্থানে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে আমরা গুরুত্ব দিয়ে তা ধ্বংস করছি। এক্ষেত্রে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। নগরবাসী একটু সচেতন হলে মশা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আমরা আশা করি দ্রুতই এডিসের আবাসস্থল নষ্ট করতে পারবো। তখন ডেঙ্গু রোগী কমে আসবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় মেয়র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যেসব ডেঙ্গু রোগীর ঠিকানা পাওয়া যাচ্ছে, সেসব ঠিকানা অনুযায়ী আশেপাশের এলাকায় এডিসের লার্ভা ধ্বংস করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান চলছে। যেসব স্থানে লার্ভা মিলছে, এর সঙ্গে সম্পৃক্তদেরকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি নির্মাণাধীন স্থাপনায় কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে।

1