চালের দাম বাড়ছেই

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:   চালের বাজারে অস্থিরতা থামছেই না। দেশে রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদনের পরেও কমছে না চালের দাম। চাল আমদানিসহ সরকারের নানা উদ্যোগও যেন কোনো কাজে আসছে না। বরং ক্রমেই আরও বাড়তির দিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম। করোনাকালে এমনিতেই মানুষের আয় কমেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এরমধ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে যেন চিড়ে চ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় চালের মূল্য বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছে তাদের।

দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে চালকল মালিকদের বার বার সতর্ক করা হলেও কেউ কোনো কর্ণপাত করছেন না। সম্প্রতি ধান-চালের অবৈধ মজুতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সারা দেশের জেলা প্রশাসকদেরকে নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এত কিছুর পরেও কেন চালের দর ঊর্ধ্বমুখী? এমন প্রশ্ন সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাদের। পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বরাবরই মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। তারা কোটি কোটি টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে গুদামে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ফলে চালের দাম তো কমছেই না, বরং আরও বাড়তির দিকে।

চালের বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম আরও ২-৪ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে মোটা পাইজাম ও স্বর্ণা চাল কেজিতে ৪৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই চাল চলতি সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়। বর্তমানে খুচরা বাজারে ২৮ চাল মান ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫৪-৬৫ টাকা পর্যন্ত, যা গত সপ্তাহে ৫০-৫২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। ভালো মানের ২৮ চাল ৫৬ টাকা কেজিতে। একইভাবে মাঝারি ধরনের নাজির শাইল ও মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৬-৬৮ টাকা কেজিতে। আর ভালো মানের সরু নাজির ও মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭২ টাকা কেজিতে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চাল কেজিতে বেড়েছে দুই টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ এবং গত বছরের তুলনায় মোটা চালে বেড়েছে ১৪.১২ শতাংশ। এ ছাড়া মাঝারি মানের চালের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। আর চিকন চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪.২৯ শতাংশ।
সম্প্রতি খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ধান-চাল মজুতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সারা দেশের জেলাগুলোতে বাজার মনিটরিং কমিটি করার কার্যক্রম জোরদার করতে জেলা প্রশাসকদেরকেও নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। ভার্চ্যুয়াল এক আলোচনা সভায় মন্ত্রী এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি অবৈধ মজুতদারদের তথ্য জেলা প্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান। মন্ত্রী বলেন, দেশে পর্যাপ্ত ফসল হয়েছে, খাদ্যশস্যের কোনো সংকট হবে না। বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক। দাম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বেশি কর ছাড় দিয়ে খাদ্যশস্য আমদানি করা হবে জানিয়ে চালকল মালিকদের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ন্যূনতম লাভে বাজারে চাল সরবরাহ করুন। এ সময় চুক্তি মোতাবেক চাল সরবরাহে ব্যর্থ চালকল মালিকদের তালিকা প্রস্তুত করতেও খাদ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেন তিনি।
তবে এতকিছুর পরেও কেন ধানের অবৈধ মজুতকারী ও সিন্ডিকেটকারীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? চালের দামই বা কমছে না কেন? রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেহেতু চালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই দাম বাড়তির দিকে। এ অবস্থায় ভারত থেকে চাল আমদানির অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। তারা বলছেন, ভারত থেকে চাল আমদানি করা হলে দাম কিছুটা কমবে। সিন্ডিকেটকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা না নিলে এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও দেখছেন না চালের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর কাওরান বাজারের ঢাকা রাইচ এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. সায়েম মানবজমিনকে বলেন, শুরুতেই সরকার কৃষকদের কাছ থেকে বেশি দামে ধান কিনেছে। আর মিল মালিকরা এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে। কারণ আমাদের দেশে একবার কোনো পণ্যের দাম বাড়লে আর কমে না। এটা এই দেশের রীতি হয়ে গেছে। আরও বাড়বে কিন্তু কমবে না। সরকার ধানের দাম বাড়ানোর কারণে এটাকে পুঁজি করে চালকল মালিকরা চালের দাম বৃদ্ধি করেই যাচ্ছে। তিনি বলেন, বড় বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা লোন নিয়ে মৌসুমের শুরুতেই বাজারের সব ধান কিনে নিয়ে মজুত করে। এটা আমাদের সবার জানা। কিন্তু সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা কেন নেয় না সেটা আমাদের বুঝে আসে না। সরকার যদি তাদেরকে ধরে জিজ্ঞেস করে যে ২০০-৩০০ কোটি টাকা লোন নিয়ে ধান কিনেছেন, সেই ধান কোথায় গেল? তখন তো বের হয়ে আসবে কারা মজুত করছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে আমরা দেখি না। অথচ তারা মজুত করে সংকট সৃষ্টি করে এভাবে দিনের পর দিন সিন্ডিকেট করেই যাচ্ছে। এসব মিল মালিকরা কি এতটাই প্রভাবশালী যে সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না? সরকার কি তাদের কাছে অসহায়? তিনি আরও বলেন, চালের বাজার মিল মালিকরাই নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যে দর নির্ধারণ করে দেবে সেটাই। এখানে আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা কিছুই করতে পারবে না।
চাঁপাই নবাবগঞ্জের জিন্নাহ অটো রাইস মিলের পরিচালক মানবজমিনকে বলেন, বাজারে চালের সংকট আছে। তাই দাম বাড়ছে। ভারত থেকে আমদানি করা হলে দাম কমবে। তিনি বলেন, মজুতের কথা যতটা বলা হয় আসলে ততটা নয়। চাল তো কোনোভাবে মজুত রাখা যায় না। নষ্ট হয়ে যায়। ধান মজুত রাখা হয় সেটা প্রয়োজন অনুসারে। সব ধান কিনে তো একবারে চাতালে তোলা যাবে না। গুদামে রেখে দিনে দিনে সেগুলো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাল করতে হবে। তবে কিছু অসাধু মিল মালিক, যারা আমাদের থেকে আরও বড় বড় ব্যবসায়ী, তারা মজুত করে থাকতে পারে। আমরা যে পরিমাণ ধান কিনি তা ৫-৬ মাসেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এমন অনেক ব্যবসায়ী আছে যারা কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে প্রচুর ধান কিনে রাখে। এই ধানগুলো তারা চাল করে অবস্থা বুঝে ধীরে ধীরে বাজারে ছাড়ে।
বছরজুড়েই বাজার স্থিতিশীল রাখতে নানা উদ্যোগের কথা জানায় সরকার। টিসিবি’র মাধ্যমে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কার্যক্রমও চলছে। ওদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে বেসরকারিভাবে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্কে প্রাথমিকভাবে ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোসাম্মৎ নাজমানারা খানুম গণমাধ্যমকে বলেছেন, অবৈধভাবে কেউ চালের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে কিনা তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। দাম নিয়ন্ত্রণে তাই বেসরকারিভাবেও কিছু আমদানি হোক। সেটার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করা হবে।

1