শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

1

ডেইলি নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:   গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।  সোমবার ৮৬ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়। এর আগে রায় প্রদানকারী বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান রায়ে স্বাক্ষর করেন। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি বিচারপতিদ্বয় সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন।
সূত্র জানায়, সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় গত রোববার এ রায়ের অনুলিপি জমা দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, সোমবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে যে কোনো পদ্ধতি (ফায়ারিং স্কোয়াডে বা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে) অনুসরণ  করে দণ্ডিত ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করতে পারবেন। এর ব্যাখ্যায় উচ্চ আদালত বলেছে, গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নজির যেহেতু খুব একটা দেখা যায় না, সেক্ষেত্রে আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উভয় পদ্ধতির যে কোনো একটি অনুসরণ করে তা কার্যকর করতে পারেন।  ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৮ ধারায় বলা হয়েছে, আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে আমৃত্যু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে। আর ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩৪ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ড হলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা মৃত্যু পর্যন্ত গুলি চালিয়ে তা কার্যকর করা যাবে। তবে বাংলাদেশে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো নজির নেই।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসামিরা যাদের ইসলামবিরোধী বা বিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল তারা ইসলামকে সু-প্রতিষ্ঠিত করার কাজে লিপ্ত। ইসলামের মূল্যবোধ সম্পর্কে আসামিদের ভ্রান্ত ধারণা এবং তাদের এহেন কর্মে পুরো দেশ ও সমাজ অশান্তিতে বিরাজমান ছিল। ইসলাম ভালো কাজের প্রশংসা করার জন্য বার বার তাগিদ দিয়েছে। দেশে মহিলা নেত্রী তা ইসলাম সম্মত নয়, তারা তা প্রতিহত করবে। আসামিদের এ ধরনের ধ্যান-ধারণা এবং শক্তি প্রদর্শন ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম।
হাইকোর্ট বলেন, আসামিরা ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারকে দোষারোপ করেছিল। অথচ ইসলামের মূল্যবোধ এবং হযরত মুহম্মদ (সা:) এর আদর্শিক দিকগুলো এ দেশের মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য এবং আগত বংশধরদের এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন ইসলামিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুধু তাই নয়, তিনি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্মের ব্যাপারেও খুবই সজাগ ছিলেন। সে অগ্রযাত্রা পরবর্তীকালে আরও জোরালোভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, বলেন- হাইকোর্ট।
পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, উদ্ধারকৃত বোমা দু’টি এতোই শক্তিশালী ছিল যে, এ দু’টির একটিও বিস্ফোরিত হলে এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধ এলাকা পর্যন্ত বিধ্বস্ত হয়ে যেত এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাটি মানুষের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতো। শুধু তাই নয়, এ বোমা বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলসহ উক্ত এলাকায় ৯ ফুট ৫ ইঞ্চি মাটির গভীরে আঘাত হানতো এবং মাটি হতে উক্ত ধ্বংসস্তূপ ৩৪ ফুট উপরের দিকে ধাবিত হতো।
গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি,  কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড, একজনের যাবজ্জীবন ও একজনের ১৪ বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা আসামিরা হলো- ওয়াসিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন ওরফে মারফত আলী, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম ওরফে শিমন খান, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন ওরফে মোসাহাব মোড়ল, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আব্দুর রাজ্জাক ওরফে আবু ওমর। এছাড়া মেহেদী হাসান ওরফে গাজী খান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন এবং আনিসুল ওরফে আনিস ও মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমানকে দেয়া ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। তবে কারাবন্দি এই দু’জনের এরই মধ্যে সাজাভোগ করা হয়ে গেলে তাদের কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বলা হয়েছে। নিম্ন্ন আদালতে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সরোয়ার হোসেন মিয়াকে খালাস দেয়া হয়েছে। হরকাতুল জিহাদের শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মামলাটিতে মূল আসামি ছিলেন। কিন্তু অন্য মামলায় এই জঙ্গি নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এ মামলা থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়েছে।
নথি থেকে জানা যায়, ২০০০ সালের ২১শে জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান আদর্শ কলেজ মাঠে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশ থেকে ৭৬ কেজি ওজনের একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা করা হয়। ২০০১ সালের ১৫ই নভেম্বর মুফতি হান্নানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২০০৪ সালের ২১শে নভেম্বর আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৩৪ জন। অন্য মামলায় হুজি নেতা মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এ মামলার রায়ে তার নাম বাদ দেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের জুন মাসে অধিকতর তদন্ত করে আরও নয়জনকে অভিযুক্ত হিসেবে যুক্ত করে সম্পূরক চার্জশিট দেয়া হয়। তখন মামলাটি পাঠানো হয় ঢাকা-২ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। সেই ট্রাইব্যুনালে ২০১৭ সালের ২০শে আগস্ট বিচার শেষ করে রায় দেয়া হয়। রায়ে ১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। এ রায়ে গুলি করে তাদের প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা বলা হয়। এরপর হাইকোর্টে রায় গেলে ১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। আজ সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হলো।

1